Logo
Logo
×
   

রাজধানী

অসম চুক্তি বাতিল ও নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের তাগিদ জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের

Icon

হাতিরঝিল (ঢাকা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪০ এএম

অসম চুক্তি বাতিল ও নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের তাগিদ জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের

জ্বালানি সংকট উত্তরণে অসম চুক্তি বাতিল এবং নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি সংকট উত্তরণে অসম চুক্তি বাতিল এবং নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিকালে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত এক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ মতামত দেন। ‘ন্যাভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট অব পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফর ডেভেলপমেন্ট (আইপিজিএডি)।

আলোচনায় জ্বালানি খাতের বর্তমান দুরাবস্থা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ উঠে আসে। বক্তারা বলেন, কারিগরি সমাধানের পাশাপাশি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা সম্ভব নয়। নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

এ সময় বক্তারা বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অসম চুক্তির ফাঁদ, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং এ মহাসংকট থেকে উত্তরণের আইনি ও নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাজ্যের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ও উৎপাদন সংকটের কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের আমলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে খরচ বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ। এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া লুট করার লোভেই এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে জ্বালানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থাই নেই।’

২৫ বছর মেয়াদি সার্বভৌম চুক্তির আইনি জটিলতা নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক মুশতাক খান আদানির চুক্তির উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমরা যদি বকেয়া বিল নিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশন বা সালিশিতে যাই, তবে নিশ্চিতভাবেই হেরে যাব। কারণ, চুক্তির দলিলে তাদের পাওনা আইনগতভাবে বৈধ। আমাদের বরং আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে চুক্তিটি করার সময়ই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছিল। আইনি ভাষায় যাকে বলে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’, অর্থাৎ চুক্তিটি গোড়া থেকেই বাতিলযোগ্য বা অবৈধ।’  

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ফেলো লাম ইয়া মোস্তাক বলেন, ‘জ্বালানি এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাসী এটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।’

চীনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘চীন কেবল কার্বন নির্গমন কমাতেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে না, বরং আমদানিনির্ভরতা কমানোও তাদের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশকেও সেদিকে হাঁটতে হবে। তবে শুধু সোলার প্যানেল আমদানি করলেই হবে না, নিজেদের দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বা ম্যানুফ্যাকচারিং বেস বাড়াতে হবে। তা না হলে এক সংকটের পরিবর্তে আমরা আরেক সংকটের ফাঁদে পড়ব।’

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় ও উদ্যোক্তা অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ‘নীতিনির্ধারকেরা যদি আইন ও অর্থনীতির সমন্বয় না বোঝেন, তবে বিপদ অনিবার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধু ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা মারাত্মকভাবে শোষিত হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের চরম ব্যর্থতার কারণে সর্বত্র সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।’

অসম চুক্তিগুলোর কারণে বাজেটে যে বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তার পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি বলেন, ‘জ্বালানি অবকাঠামো যদি বিদেশি শক্তির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’

সংসদ সদস্য মানসুরা আলম জ্বালানি খাতে নীতিগত পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রযাত্রার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক জ্বালানি সংকটকে সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আসলে বিদেশি অলিগার্ক বা লুটেরাদের হাতে জিম্মি করা হয়েছে।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম