আগৈলঝাড়ায় ঐতিহ্যবাহী মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত
আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম
আগৈলঝাড়ায় ঐতিহ্যবাহী মারবেল মেলা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ২৪৬ বছরের প্রাচীন মারবেল মেলা বুধবার (১৪ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়েছে। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রামানন্দের আঁক গ্রামে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় শুধু আগৈলঝাড়া উপজেলাই নয়, পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়া, উজিরপুর, ডাসার, মাদারীপুর, কালকিনি, গৌরনদী, বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন বয়সের হাজার-হাজার নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।
মেলা কমিটির সভাপতি নির্মল মন্ডল জানান, রামানন্দের আঁক গ্রামে ২৪৬ বছর পূর্বে মা সোনাই চাঁদ আউলিয়ার ৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়। সাত বছর বয়সে স্বামী মারা গেলে নিঃসন্তান অবস্থায় শ্বশুরবাড়িতে একটি নিমগাছের গোড়ায় শিবের আরাধনা ও পূজা-অর্চনা শুরু করেন। ক্রমশ তার অলৌকিত্ব ছড়িয়ে পড়লে ওই স্থানে বাৎসরিক পূজার আয়োজন করা হয়। মা সোনাই চাঁদ আউলিয়ার জীবদ্দশায় আনুমানিক ১৭৮০ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিনে সাংস্কৃতিক গান, বৈষ্ণব সেবা, নিরামিশ খাবার, নবান্ন উৎসব, মারবেল মেলা ও মারবেল খেলার মাধ্যমে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তার মৃত্যুর পরে ওই বাড়িটি মা সোনাই চাদঁ আউলিয়ার বাড়ি হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করে।
প্রতি বছর এই দিনটি উপলক্ষে বৈষ্ণব সেবা, নাম সংকীর্ত্তন, কবিগান শেষে সোয়া মণ (৫০ কেজি) চালের গুঁড়ার সাথে সোয়া মণ আঁখের গুড়, ৫০ জোড়া নারকেল ও প্রয়োজনীয় কলাসহ অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে নবান্ন তৈরি করে মেলায় আগত দর্শণার্থীদের প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম আকর্ষণ পৌষ সংক্রান্তিতে বাস্তুপূজা উপলক্ষে ২৪৬ বছর ধরে এ গ্রামে মারবেল মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ওই বাড়ির মেয়ে মারবেল মেলা উপলক্ষে ঢাকা থেকে শিখা বিশ্বাস পরিবারসহ এসেছেন।
গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে মারবেল খেলার জন্য এসেছেন হরষিদ সরকার, তাপস দাস, মনমথ মন্ডল, উজিরপুর উপজেলা হারতা গ্রাম থেকে সবিতা দাস ও অনিতা মধু পরিবারের সবাইকে নিয়ে মারবেল মেলায় এসেছেন।
তিনি জানান, মেলায় এসে মারবেল খেলতে পেরে ভালো লাগছে। মারবেল খেলার মূল রহস্য সম্পর্কে স্থানীয় চিত্র রঞ্জন বিশ্বাস (৮২) জানান, আমাদের পূর্বপুরুষরা এ খেলার মাধ্যমে মেলার প্রচলন করেছিল; যা আজও অব্যাহত আছে। তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আমরা সেই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এদিনটি ঘিরে রামানন্দের আঁক গ্রামে মহোৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়-স্বজনদের এ মার্বেল মেলায় আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মারবেল খেলা চলছে। রাস্তার উপর, বাড়ির আঙিনা, অনাবাদী জমি, বাগানসহ সর্বত্রই মারবেল খেলার আসর বসেছে। মার্বেল মেলা উপলক্ষে রামানন্দের আকঁ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বসেছে বাঁশ-বেত শিল্প সামগ্রী, মনিহারি, খেলনা, মিষ্টি, ফলসহ বিভিন্ন ধরনের দোকান। কোদালধোয়া গ্রামের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র সুমন হালদার ও ১০ম শ্রেণীর নির্মল সরকার জানায়, সারা বছর টাকা জমিয়েছি মারবেল খেলার জন্য। শিশু থেকে শুরু করে কিশোর, কিশোরী, যুবক-যুবতীরা মেলার প্রধান আকর্ষণ মারবেল খেলায় অংশগ্রহণ করেন।
এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া থানার ওসি (তদন্ত) সুশংকর মল্লিক সাংবাদিকদের জানান, এই মারবেল মেলায় আগত সাধারণ লোকজন ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের লোকজন রয়েছেন। মেলা পরিচালনার জন্য কমিটি রয়েছে। মেলায় মারবেল খেলার জন্য অনেকে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন; তাদের জন্য আগে থেকেই ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
