অটিজমকে জয় করে এসএসসিতে মিথিলার সাফল্য
চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মিথিলা তাবাস্সুম। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই তরুণীকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি অটিজমে আক্রান্ত। সমবয়সিরা যখন খেলাধুলা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যস্ত, তখন মিথিলাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে।
ছবি আঁকা, গান, কবিতা আবৃত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী মিথিলা এবার এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করে সেই লড়াইয়ের নতুন অধ্যায় লিখেছেন।
শত প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই তরুণী এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় চাটমোহর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৪.৭১ জিপিএ পেয়ে ‘এ’ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার এই সাফল্যে পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। দীর্ঘ এই পথচলায় মিথিলার পাশে থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন মা পিয়াসা জাফরীন এবং শিক্ষকরা। আর জটিল এই পথকে মসৃণ করতে বাবার আত্মত্যাগও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মিথিলা নিজের মেধা ও প্রচেষ্টায় প্রমাণ করেছেন, অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক পরিচর্যা, শিক্ষা ও সহযোগিতা পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। মিথিলার স্বপ্ন পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর মা-বাবার স্বপ্ন মেয়েকে স্বাবলম্বী করে তোলা।
তবে মিথিলার এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। স্কুলে ভর্তি করতে অনীহা, অন্য অভিভাবকদের আপত্তি এবং নানা সামাজিক তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কোনো বাধাই মিথিলার এগিয়ে চলাকে থামাতে পারেনি।
মিথিলার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার মা পিয়াসা জাফরীন চাটমোহর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। চাটমোহর পৌর শহরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে পরিবারটি। পাঁচ বছর বয়সে কথা বলা শেখে মিথিলা। বাবার চাকরির সুবাদে প্রথমে রাজশাহী এবং পরে ঢাকায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্কুলে তাকে ভর্তি করা হয়। তবে সেখানে আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় পরিবারটি চাটমোহরে ফিরে আসে।
পরে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে মিথিলাকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক না হওয়ায় কয়েকজন অভিভাবক তাকে স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও দমে যাননি তার মা পিয়াসা জাফরীন। ধীরে ধীরে মিথিলার উন্নতি হতে থাকে।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ও তাকে আরেক দফা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। কয়েকজন অভিভাবক মিথিলাকে ওই স্কুল থেকে না সরালে তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করানোর হুমকি দেন। পরে বাধ্য হয়ে মা-বাবা তাকে চাটমোহর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মিথিলাকে।
মিথিলার এই সাফল্যের অন্যতম কারিগর তার মা পিয়াসা জাফরীন। শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি নিজের একমাত্র মেয়ের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন তিনি। দিয়েছেন সাহস ও অনুপ্রেরণা। তবে পরিবারটির জন্য ছিল আরও বড় পরীক্ষা। মিথিলার ছোট ভাই জাফির বিন মুহিতও অটিজমে আক্রান্ত।
দুই সন্তানের বিশেষ অবস্থার কারণে মিথিলার বাবা আব্দুল মুহিত নিজের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। জীবনের অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে এই দম্পতি সন্তানদের ঘিরেই নিজেদের পৃথিবী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। দুই সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘ এই পথচলায় তারা কখনো হাল ছাড়েননি।
মিথিলাকে মা নাচ, গান, আবৃত্তি ও ছবি আঁকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অটিজমে আক্রান্ত মিথিলা অর্জন করেছেন নানা পুরস্কার। প্রতিভা ও অধ্যবসায় থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না—মিথিলা যেন তারই উদাহরণ।
মিথিলার সাফল্যে বাবা আব্দুল মুহিত বলেন, ‘আমি মিথিলার ফলাফলে ভীষণ খুশি হয়েছি। আমরা চাই মিথিলা নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু আমাদের দুই সন্তানই অটিজমে আক্রান্ত। ওদের নিয়ে আমাদের খুব চিন্তা হয়। আমরা যখন থাকব না, তখন ওদের কী হবে? অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
মা পিয়াসা জাফরীন বলেন, ‘মিথিলার জন্য এই পথচলা সহজ ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব কাজ ছিল মিথিলাকে পড়ালেখা শেখানো। মেয়েকে এগিয়ে নিতে সারা পৃথিবী একদিকে, আমি ছিলাম উলটো দিকে। মেয়েকে নিয়ে সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। মিথিলার এই সাফল্যে আমি ভীষণ খুশি।’
চাটমোহর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলিফ উদ্দিন বলেন, ‘অটিজমে আক্রান্ত মিথিলা খুব মেধাবী ছাত্রী। গান, কবিতা আবৃত্তি, অঙ্কন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে সে পারদর্শী। মায়ের প্রচেষ্টা এবং স্কুলের শিক্ষকদের আলাদা নজরের কারণে তার পড়ালেখা অনেক সহজ হয়েছে। অটিজমকে জয় করে এ পর্যন্ত আসা অনেক বড় বিষয়। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’
