Logo
Logo
×
   

সারাদেশ

২৫ বছরের অপেক্ষা ফুরাল, মায়ের কাছে ফিরলেন ফরিদ

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম

২৫ বছরের অপেক্ষা ফুরাল, মায়ের কাছে ফিরলেন ফরিদ

দীর্ঘ ২৫ বছর পর মায়ের কোলে ফিরলেন সন্তান। ছবি: যুগান্তর

‘ও বাপ, তুই হডে আছিলা! ও বাপ বাপ, তোরে ইদিলা হনে গইজ্জে! ১০ বছর গুরা হালে তোরে দেইকখি, আর ন দেহি। ২৫ বছর পর তোরে পাইয়্যি।’

কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলে কাঁদতে কাঁদতে ছেলে মোহাম্মদ ফরিদকে বুকে জড়িয়ে ধরেন মা নূরজাহান বেগম। যে শিশুটিকে পরিবার মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল, সেই মোহাম্মদ ফরিদ দীর্ঘ ২৫ বছর পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন। 

১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বিদেশে যাওয়ার পর মানবপাচারের শিকার হয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন ফরিদ।

গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এটুকু ছাড়া তেমন কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না তিনি। 

বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি তাকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে।

ফরিদকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে শুরু হয় অনুসন্ধান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তার পরিবারের সন্ধান পান।

গত বুধবার বিকালে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কথোপকথনের একপর্যায়ে ফরিদের হাতে একটি আঙুল বেশি—অর্থাৎ ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সৈয়দ আলম। ছোটবেলার এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই দুই ভাইয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

ফরিদ ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে তারা পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ফরিদ। পরে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার পর এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তিনি তুরস্কে পৌঁছান। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। পরে তুরস্কের পুলিশ তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরিদকে তার ছোট ভাই ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত সৈয়দ আলম বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমাদের আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্র্যাকের সহায়তায় বড় ভাই ফরিদকে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ার উদ্দেশে রওনা হন সৈয়দ আলম। শুক্রবার সকালে তারা বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে আমরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছি। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

তিনি বলেন, তবে শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, আমরা ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কিছু করতে চাই, যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক এ টি এম মাহবুবুল করিম বলেন, মানবপাচারের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্নভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এসব পথে মানবপাচার প্রতিরোধে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .