ছয় আঙুলে মিলল পরিচয়
দুই পা হারিয়েও ২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফেরার আনন্দে ফরিদ
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম
দুই পা হারিয়েও ২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফেরার আনন্দে ফরিদ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। এরপর ট্রেন দুর্ঘটনায় হারান দুই পা। পরে মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে চলে যান তুরস্কে। দীর্ঘ ২৫ বছর পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরে নিজ বাড়িতে পৌঁছেছেন তিনি।
বাড়ি ফিরেই যেন আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সীমা নেই ফরিদের। হুইলচেয়ারে বসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাবার বাড়ি ও পুরো উঠানে। চারপাশের পরিচিত পরিবেশ আর আপনজনদের কাছে পেয়ে যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেছেন, তার দুই পা নেই।
শুক্রবার কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যাপালং ইউনিয়নের নাছিরপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফরিদের সঙ্গে দেখা হলে এমন দৃশ্যই দেখা যায়।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর মায়ের মুখ, ছোট ভাই ও বাল্যবন্ধু শাহাজানকে কাছে পেয়ে আবেগ ও আনন্দে ভেসে যাচ্ছেন তিনি। কখনো মায়ের পাশে বসছেন, কখনো ভাই ও বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন। আবার হুইলচেয়ারে বসে ঘুরে দেখছেন শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত পুরো উঠান।
ফরিদের বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগম ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে যে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, অবশেষে সেই ছেলেকেই নিজের উঠানে ফিরে পেয়েছেন তিনি। ছেলেকে সামনে বসিয়ে কখনো তার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, আবার কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। এত বছর পর ছেলেকে কাছে পাওয়ার আনন্দ যেন ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না তিনি।
নুরজাহান বেগম বলেন, ২৫ বছর ধরে ছেলের কোনো খবর ছিল না। কত দিন যে মনে হয়েছে, আমার ছেলে হয়তো আর বেঁচে নেই। আল্লাহর কাছে কত কান্নাকাটি করেছি, ছেলেকে যেন একবার দেখতে পারি। শেষপর্যন্ত আল্লাহ আমার ফরিদকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ছোটবেলায় আমার ছেলে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। তখন তো বুঝতেই পারিনি, এত বছর তাকে দেখতে পাব না। ছেলেকে হারানোর কষ্ট নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছি। এখন আমার চোখের সামনে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমি যেন আবার আমার ছেলেকে নতুন করে ফিরে পেয়েছি।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের দুই পা নেই, অনেক কষ্ট করেছে; কিন্তু সে বাড়িতে ফিরে এসেছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। এখন আমি চাই, আমার ছেলে আমার কাছেই থাকুক। জীবনের বাকি দিনগুলো যেন মা-ছেলে একসঙ্গে কাটাতে পারি।
ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম উখিয়ার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। এত বছর পর তাকে ফিরে পাব, এটা কখনো ভাবিনি। এখন তাকে নিজের বাড়িতে, মায়ের কাছে দেখতে পারছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
তিনি বলেন, ভাইকে বাড়ির উঠানে হুইলচেয়ারে ঘুরতে দেখে মনে হচ্ছে, ২৫ বছর আগের সেই দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে। এত কষ্টের পরও বাড়িতে ফিরে ভাইয়ের মুখে যে হাসি দেখছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
ফরিদের বাল্যবন্ধু শাহাজান বলেন, ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি, একসঙ্গে বড় হয়েছি। এরপর ফরিদ হারিয়ে গেল। দীর্ঘ ২৫ বছর তার কোনো খবর ছিল না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, সে হয়তো আর বেঁচে নেই। এত বছর পর বন্ধুকে আবার চোখের সামনে দেখতে পারব, এটা কখনো ভাবিনি। শাহাজান বলেন, আজ বাড়িতে এসে ফরিদকে হুইলচেয়ারে ঘুরতে দেখে ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়ছে। ওকে ফিরে পেয়ে আমরা খুব আনন্দিত। বাড়িতে ফিরে ওর মুখে যে আনন্দ দেখছি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে পাকিস্তানে
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানে যান ফরিদ। সেখানে বাবা-ছেলে জীবিকার সন্ধানে ছিলেন। একপর্যায়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ফরিদ। চিকিৎসকদের পরামর্শে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।
এরপর উন্নত জীবন ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারী একটি চক্র তাকে তুরস্কে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘদিন অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করেন তিনি। সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ফরিদ। সম্প্রতি তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
নিজের পরিচয়ও দিতে পারছিলেন না
গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে একটি ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। শৈশব থেকে বিদেশে থাকার কারণে তিনি ঠিকমতো নিজের পরিচয়ও দিতে পারছিলেন না। শুধু নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’ ঠিকানাটুকু বলতে পারছিলেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এভিয়েশন সিকিউরিটি বা এভসেক সদস্যরা তাকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে উখিয়ার মরিচ্যাপালং নাছিরপাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।
ছয় আঙুলে মিলল হারানো পরিচয়
পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর বুধবার বিকালে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
পরে ফরিদের একটি হাতে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। বাড়তি ওই আঙুল দেখে তারা ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত করেন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই তার এক হাতে ছয়টি আঙুল ছিল। ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ; কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে।
তিনি আরও জানান, শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই নয়, ফরিদ যাতে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিতে পারেন, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এটিএম মাহবুবুল করিমও ফরিদকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরে এখন মা, ভাই ও বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন ফরিদ। হুইলচেয়ারে বসে ঘুরে দেখছেন শৈশবের সেই উঠান, যে উঠান ছেড়ে ১০ বছর বয়সে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন। জীবনের অনেকটা সময় হারিয়ে গেলেও আপনজনদের কাছে ফিরে পাওয়ার আনন্দে যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেছেন, তার দুই পা নেই।
