Logo
Logo
×
   

ডাক্তার আছেন

বিয়ে দিলে কি মানসিক রোগ ভালো হয়?

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৭ এএম

বিয়ে দিলে কি মানসিক রোগ ভালো হয়?

অনেকের ধারণা, মানসিক রোগে আক্রান্ত কাউকে বিয়ে করিয়ে দিলেই হয়তো তার রোগ সেরে যাবে। বাস্তবে এটি ভ্রান্ত ধারণা। বিয়ে কোনো মানসিক রোগের চিকিৎসা নয়। বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ছাড়াই শুধু বিয়ে দিলে রোগীর সমস্যা কমার পরিবর্তে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে যার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে, তার জীবনও অকারণে দুঃসহ, অনিশ্চিত, মর্মান্তিক  ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে কি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বিয়ে করবেন না?

অবশ্যই করবেন। মানসিক রোগ মানেই একজন মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা কিংবা সুন্দর সংসার গড়ার অধিকার শেষ হয়ে যাওয়া নয়। যথাযথ চিকিৎসা, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে একজন মানসিক রোগীও অন্য সবার মতোই সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারেন।

পৃথিবীতে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা মানসিক রোগের সঙ্গে লড়াই করে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ ও স্থিতিশীল জীবন ফিরে পেয়েছেন। তারা ভালোবেসেছেন, বিয়ে করেছেন, কর্মজীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, এমনকি কেউ কেউ নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেছেন। তাদের এই সাফল্যের পেছনে ওষুধের পাশাপাশি একজন সহানুভূতিশীল, ধৈর্যশীল ও ভালোবাসায় ভরা জীবনসঙ্গীর অবদান ছিল অপরিসীম। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চেও সেই জীবনসঙ্গী ছিলেন গর্ব, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতীক। অনেকেই অকপটে স্বীকার করেছেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে পাশে থাকা সেই মানুষটির সমর্থনই তাদের আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল।

আমাদের সমাজেও অনেক সচেতন অভিভাবক আছেন, যারা প্রথমে সন্তানের মানসিক রোগের যথাযথ চিকিৎসা করান, ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং পরে সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ফলাফলও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তাদের অনেকেই আজ সুখী, স্থিতিশীল ও পরিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। 

আমারও অসংখ্য রোগী আছেন, যারা মানসিক রোগকে নিয়ন্ত্রণে এনে আজ পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে অত্যন্ত সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছেন।

অন্যদিকে, কিছু অভিভাবক আছেন, যারা রোগটি গোপন করেন, চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেন না এবং মনে করেন বিয়েই সমস্যার সমাধান। বাস্তবে এমন সিদ্ধান্তের পরিণতি প্রায়ই বেদনাদায়ক হয়। দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস, সংঘাত, বিচ্ছেদ এমনকি কখনো কখনো সহিংসতা, আত্মহত্যা বা হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে পারে। পরে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অনেকেই সন্তানের মানসিক রোগের কথা অস্বীকার করেন। কেউ কেউ আবার দাবি করেন, কোনো কবিরাজ, মোল্লা বা ভণ্ডপীরের পরামর্শেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এসব বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এগুলো কখনোই চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না।

একটি বিয়ে কোনো চিকিৎসা নয়। বরং সুস্থ ও স্থিতিশীল একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের জীবনের বন্ধন। তাই এই বন্ধনের ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং সঠিক চিকিৎসা। গোপনীয়তা বা প্রতারণা নয়।

আসুন, মানসিক রোগকে লজ্জা বা কুসংস্কারের চোখে না দেখে একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে গ্রহণ করি। সময়মতো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিই, নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় মনোচিকিৎসা চালিয়ে যায় এবং রোগীর পাশে ভালোবাসা ও ধৈর্য নিয়ে দাঁড়াই। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবারকে রক্ষা করতে পারে; ভেঙে যাওয়া স্বপ্নকে আবার নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে পারে।

ডা. মু. সাঈদ এনাম 

সহযোগী অধ্যাপক

ব্রেইন স্নায়ু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .