Logo
Logo
×
   

ডাক্তার আছেন

বন্যায় নানান স্বাস্থ্য ঝুঁকি, কী করবেন?

Icon

ডা. সি. এম. শামীম কবীর

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

বন্যায় নানান স্বাস্থ্য ঝুঁকি, কী করবেন?

দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা অন্যতম। ভারি সৃষ্টি থেকে এ বছর বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। স্বাস্থ্যকর খাবার, সুপেয় পানি, থাকার নূনতম পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বন্যা দুর্গতরা। 

বন্যার সময় কিছু রোগ-বালাই দেখা দেয়।দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি এসব রোগ-বালাই থেকেই সতর্ক এবং সচেতন থাকতে হবে সবাইকে।

* বিশুদ্ধ পানি

বন্যার সময় পানির উৎস হওয়ায় তা ভালোমতো ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করাসহ গৃহস্থালির অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করতে হবে। বন্যার পানিতে টিউবওয়েল তলিয়ে গেলে এক কলস পানিতে তিন-চার চা চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে টিউবওয়েলের ভেতর এ পানি ঢেলে দিন। এবার আধা ঘণ্টা রেখে এরপর একটানা আধা ঘণ্টা চেপে পানি বের করে ফেলে দিলে সে পানি খাওয়ার উপযোগী হয়। আর ব্লিচিং পাউডার না থাকলে এক ঘণ্টা টিউবওয়েলের পানি চেপে বের করে ফেলতে হবে। তবে নিরাপত্তার জন্য টিউবওয়েলের পানিও ভালোমতো ফুটিয়ে নেওয়া উচিত এবং পানি একটানা ৩০ মিনিট ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করতে হবে। কিন্তু পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি দেড় লিটার খাওয়ার পানিতে ৭.৫ মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট (হ্যালো ট্যাব), তিন লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট এবং ১০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রেখে দিলে পানি বিশুদ্ধ হয়। আবার বাসার পানির ট্যাংকের প্রতি এক হাজার লিটার পানিতে ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার এক ঘণ্টা রাখলে পানি বিশুদ্ধ হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ভাইরাস জীবাণু ধ্বংস হয় না।

* ডায়রিয়া প্রতিরোধে

বন্যায় প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়রিয়া। এজন্য খাওয়ার আগে এবং পায়খানা করার পর হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ডায়রিয়া শুরু হলে পরিমাণ মতো খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। দুই বছরের কম শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-১২ চা চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ২০ থেকে ৪০ চা চামচ খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে। খাওয়ার স্যালাইন না থাকলে বিকল্প হিসাবে লবণ-গুড়ের শরবত খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি ভাতের মাড়, চিঁড়ার পানি, ডাবের পানি, কিছু পাওয়া না গেলে শুধু নিরাপদ পানি খাওয়ানো যেতে পারে। এ সময় শিশুর পুষ্টিহীনতা রোধে খিচুড়ি খাওয়ানো যেতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলও খাওয়ানো যেতে পারে। যদি পাতলা পায়খানা ও বমির মাত্রা বেড়ে যায়, তাহলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

* খাবার গ্রহণে সতর্কতা

বন্যার সময় পচা-বাসি খাবার খেতে বাধ্য হয় অসংখ্য মানুষ। ফলে ছড়িয়ে পড়ে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ। খিচুড়ি খাওয়া এ সময় স্বাস্থ্যোপযোগী। খাবার প্লেট সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। পানি বেশি খরচ হয় বলে অনেকে প্রথমে একবার স্বাভাবিক পানিতে থালা-বাসন ধুয়ে তারপর ফুটানো পানিতে ধুয়ে নেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। এতে থালা-বাসনে অনেক ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।

* দুর্ঘটনা থেকে সাবধানতা

বন্যার সময় আকস্মিক নানা দুর্ঘটনা ঘটে। সাধারণত বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া, সাপ ও পোকা-মাকড়ের কামড়ের ঘটনাগুলো বেশি ঘটে। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা পানিতে পড়ে থাকতে দেখলে তা স্পর্শ না করে বিদ্যুৎ কর্মীদের জরুরিভাবে খবর দিতে হবে। সাপ ও ইঁদুর তাদের আবাস হারিয়ে শুকনো স্থানে মানুষ ও গবাদি পশুপাখির সঙ্গে অবস্থান নেয়। এ জন্য সাপ ও ইঁদুরে কাটার পরিমাণ বেড়ে যায়। বিষহীন সাপে কাটলে ভয়ের কিছু নেই। তবে বিষধর সাপে কাটলে সাপে কাটা স্থানের সামনে মোটা কাপড় বা গামছা বা রশি দিয়ে দিয়ে গিঁট দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালে জরুরিভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম এবং টিটেনাস প্রতিষেধক দিতে হবে। ইঁদুরে কাটলেও অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

* মলত্যাগে সতর্কতা

বন্যার সময় যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করা উচিত নয়। এতে পেটের পীড়া ও কৃমির সংক্রমণ বেড়ে যায়। সম্ভব হলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মলত্যাগ করতে হবে এবং মলত্যাগের পরে সাবান বা ছাই দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। মলত্যাগের সময় কখনো খালি পায়ে থাকলে বক্রকৃমির জীবাণু শরীরে সংক্রমিত হয়। এ সময় বাসার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত। তবে দুই বছর বয়সের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

* বন্যা-পরবর্তী সতর্কতা

বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষ (দুই বছরের নিচের শিশু ছাড়া) ও গবাদিপশুকে কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। শামুক মানুষ ও পশু-পাখির বিভিন্ন পরজীবীর বা কৃমির মধ্যবর্তী পোষক হিসাবে কাজ করে। এসব শামুক হাঁসের খাবার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা এগুলোকে নিধন করতে হবে। এ ছাড়া কৃমিনাশক ওষুধ নিয়মিতভাবে চার থেকে ছয় মাস অন্তর খাওয়াতে হবে।

লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .