বিবিএফ এর পর্যবেক্ষণ
কার্যকর ব্রেস্টফিডিং কর্ণার নেই বেশিরভাগ হাসপাতালে
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাতৃদুগ্ধপান, মা ও শিশু পুষ্টি উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) ২০২১ সালে বিশ্বে প্রথম স্থান (৯১ দশমিক ৫ শতাংশ) অর্জন করে। তবে ২০২৫ সালে তা সপ্তমে নেমে যায়। নিম্নমুখী এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি বিবিএফ দেশের ১২টি হাসপাতালে মাতৃদুগ্ধপান, মা ও শিশু পুষ্টি উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে বর্তমানে সেখানে কোন ব্রেস্টফিডিং কর্নার (শিশুকে স্তন্যদান কক্ষ) নেই। এমনকি হাসপাতালে ‘বেবি-ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল ইনিশিয়েটিভ’ বা শিশুবান্ধব হাসপাতাল উদ্যোগও (বিএফএইচআই) কার্যকর নয়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসে বিবিএফ ১২টি বিএফএইচআই প্রশিক্ষিত হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কনফারেন্স হলে বিবিএফ আয়োজিত সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধপান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন মাতৃদুগ্ধপান সুরক্ষা ও সহায়তা কার্যক্রমে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে প্রায় ৩৫ টাকার সমতুল্য সুফল পাওয়া যেতে পারে। একইভাবে পুষ্টি উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগ শিশুর অপুষ্টি, সংক্রমণ, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও চিকিৎসা যায় কমায়। শিশুর মেধা, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা ও ভবিষত আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। দেশে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ)-এর ১ হাজার ৯১টি হাসপাতালে শিশুবান্ধব প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে। ৩ হাজার ৪৯৮টি মাদার সাপোর্ট গ্রুপ (এমএসজি) বা মা সহায়ক দল সেবা দিচ্ছে।
সেমিনারে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন, বিধিমালা ও স্বাস্থ্যপেশাজীবিদের করণীয় ও বর্তমান অবস্থা সম্পীর্কিত’ তথ্য তুলে ধরেন বিবিএফ-এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. সুফিয়া খাতুন।
তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণে ৭২ জন চিকিৎসক ও নার্সের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পর্যবেক্ষিত কোনো হাসপাতালেই ল্যাক্টেশন ম্যানেজম্যান্ট সেন্টার (এলএমসিআই) মাদার সাপোর্ট গ্রুপ (এমএসজি) পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় বিএফএইচআই নির্দেশিকা, হাসপাতাল নীতি ও ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউশন বা মায়ের দুধের পরিপূরক (বিএমএস) এর ক্ষতিবিষয়ক উপকরণের মাত্র ২ শতাংশ সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত ছিল। প্রায় সব হাসপাতালে বিএমএস পণ্যের প্রদর্শন, প্রচারসামগ্রী বা পরোক্ষ প্রচারের মাধ্যমে বিএমএ আইন ২০১৩ লঙ্ঘন করেছে। নিয়মিত অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ ও লঙ্ঘনের পর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা ছিল না।
বিএমএস আইন পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ও প্রধান ফলাফল সম্পর্কে বলা হয় বিবিএফ-এর পর্যবেক্ষেণে ১২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ৪০টি বাজারের প্রায় ২৬০টি দোকান এবং মায়ের দুধের পরিপূরক খাবার দুধ বিক্রি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন ৪৮টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা গেছে শতভাগ দোকানে বিএমএস পণ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়েছে। ৫ শতাংশ পণ্য অনিবন্ধিত বা নিবন্ধন প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ ছিল। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একশ শতাংশ ক্ষেত্রে ফেসবুক ইউটিউব লাইভের মাধ্যমে চিকিৎসা বা পুষ্টি পরামর্শের আড়ালে বিএমএস প্রচার করা হয়েছে। শতভাগ দোকানদার নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অথবা স্বাস্থ্যকর্মীর টোকেন/রেফারেলের মাধ্যমে বিএমএস বিক্রি করেছেন।
৯০ শতাংশ বিএমএস কোম্পানি ইপিআই কেন্দ্র, আইএমসিআই ও এএনসি কর্নার এবং স্যাকমোদের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছেন। সাধারণ ফার্মেসিতে লঙ্ঘন সীমিত থাকলেও হাসপাতাল প্রাঙ্গণের ফার্মেসিতে বিএমএস প্রদর্শন ও বিক্রি বেশি দেখা গেছে। পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্টরা আইন বাস্তবায়নে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যপেশাজীবী ও বিক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি বলে জানানো হয়েছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক, ডা. রওশন জাহান আখতার আলো, গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্ল্যাইড হিউম্যান সায়েন্স-এর অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মেহেরুন নেছা, নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সামিনা আহমেদ, বিএমআরসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতারসহ স্বাস্থ্যপেশাজীবীরা।
সেমিনারে বিবিএফ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এস কে রায়ের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে শিশুর মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব নিয়ে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএফ সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. সারিয়া তাসনিম।
তিনি বলেন, মায়ের বুকের দুধকে ‘শিশুর প্রথম টিকা’ বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু একচেটিয়াভাবে মায়ের দুধ পান করে, তাদের ক্ষেত্রে ইসকেমিক হৃদ্রোগে মৃত্যুঝুঁকি ৪৩ শতাংশ, স্ট্রোকে ৩৩ শতাংশ এবং ক্যান্সারজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো হলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে।
অধ্যাপক ডা. এস কে রায় বলেন, এখন প্রয়োজন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ (অর্থবরাদ্দ এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তায়ন) এবং অগ্রগতি ডিজিটাল ম্যাপিং-এর মাধ্যমে চিহ্নিত লাইট স্ট্যাটাসের মতো নিয়মিত পর্যালোচনা করা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে নীতি ও মাঠপর্যায়ের যৌথ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় বিবিএফ পরিচালক খুরশিদ জাহান। ড. জিন্নাত রেহানা পেশাগত জীবনে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পাল করার আহ্বান জানান।
