Logo
Logo
×
   

ডাক্তার আছেন

চিকিৎসককে বাঁচাতে হবে, তবেই বাঁচবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ডা. আরমান রেজা চৌধুরি

ডা. আরমান রেজা চৌধুরি

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

চিকিৎসককে বাঁচাতে হবে, তবেই বাঁচবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

এআই দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসংক্রামক রোগের বিস্তার, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উন্নত চিকিৎসার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও বহুগুণ বেড়েছে। এ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। তাই চিকিৎসক তথা স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা কোনো একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বিষয় নয়; এটি দেশের মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন কর্মজীবন

একজন চিকিৎসককে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, উচ্চতর ডিগ্রি এবং নিরবচ্ছিন্ন পেশাগত শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর তাকে প্রায়ই অতিরিক্ত রোগীর চাপ, সীমিত জনবল, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হয়।

অনেক সরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী দেখতে হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি রোগীর পূর্ণ ইতিহাস নেওয়া, বিস্তারিত পরীক্ষা করা, রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া এবং মানসিক সহায়তা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ে। রোগী তখন মনে করেন, চিকিৎসক তাকে সময় দিচ্ছেন না। অন্যদিকে চিকিৎসক মনে করেন, সীমিত সময় ও সম্পদে তার পক্ষে এর বেশি করা সম্ভব নয়। এখান থেকেই চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি ও অসন্তোষ তৈরি হয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকরা কেন থাকতে চান না

সরকারি চিকিৎসকদের জেলা, উপজেলা ও দুর্গম অঞ্চলে পদায়ন করা হলেও অনেককে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এ সমস্যাকে শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখা সঠিক নয়। এর পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ রয়েছে।

অনেক স্থানে নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের অভাব রয়েছে। চিকিৎসকের সন্তানদের জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জীবনসঙ্গীর কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা সীমিত। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা, যন্ত্রপাতি, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মী না থাকলে একজন চিকিৎসক তার দক্ষতা অনুযায়ী সেবা দিতে পারেন না।

একজন সার্জনকে যদি অপারেশন থিয়েটার, অ্যানেসথেশিয়া সেবা বা প্রশিক্ষিত নার্স ছাড়া কাজ করতে হয় কিংবা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে রোগীর চিকিৎসা যেমন ব্যাহত হয়, ঠিক তেমনি চিকিৎসকের পেশাগত সন্তুষ্টিও কমে যায়। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক পাঠানোর পাশাপাশি সেখানে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাও অপরিহার্য।

চিকিৎসকদের আত্মসমালোচনার জায়গা

স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব দুর্বলতার দায় শুধু সরকার, প্রশাসন বা রোগীর ওপর চাপিয়ে দিলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চিকিৎসক সমাজেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারি কর্মঘণ্টায় উপস্থিত থাকা, সময়মতো রোগী দেখা, দায়িত্বশীল আচরণ, পেশাগত নৈতিকতা এবং রোগীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব। সরকারি চাকরির নির্ধারিত সময়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা, সরকারি রোগীকে অযৌক্তিকভাবে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে যেতে উৎসাহিত করা কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলার মতো ঘটনা যদি ঘটে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ধরনের অনিয়ম হয়তো সব চিকিৎসকের আচরণের প্রতিনিধিত্ব করে না, কিন্তু অল্প কিছু ঘটনার কারণেও পুরো পেশার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই স্বচ্ছ তদারকি, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, রোগীর অভিযোগ যাচাই এবং ন্যায্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টা, বেতন, ছুটি এবং দায়িত্বের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দিনের পর দিন অতিরিক্ত রোগী দেখা, রাতের ডিউটি, জরুরি সেবা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার পরও যদি একজন চিকিৎসক ন্যায্য কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা না পান, তবে তাঁর মধ্যে ক্লান্তি ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তাই জবাবদিহির পাশাপাশি ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

চিকিৎসক-রোগী আস্থার সংকট

চিকিৎসা সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। রোগের জটিলতা, দেরিতে হাসপাতালে আসা, সীমিত চিকিৎসা সুবিধা কিংবা চিকিৎসায় স্বাভাবিক ঝুঁকির কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং না করলে এসব পরিস্থিতি চিকিৎসকের অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে রোগী বা স্বজনের সঙ্গে রূঢ় আচরণ, অস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সময় না দেওয়াও সমস্যা বাড়ায়। চিকিৎসকদের যোগাযোগ দক্ষতা, সহমর্মিতা ও খারাপ সংবাদ দেওয়ার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একইভাবে রোগী ও স্বজনদেরও বুঝতে হবে, চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সব রোগীকে সুস্থ করার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।

হাসপাতালে হামলা, ভাঙচুর বা চিকিৎসককে হেনস্তা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। প্রতিটি হাসপাতালে দ্রুত ও নিরপেক্ষ অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো থাকা দরকার।

সমাধানের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা

বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা, মানসম্মত আবাসন, পরিবারের শিক্ষা ও চিকিৎসাসুবিধা এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে অগ্রাধিকারভিত্তিক বদলির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

দুর্গম এলাকায় সফলভাবে দায়িত্ব পালনকারীদের উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও ফেলোশিপে বিশেষ মূল্যায়ন দেওয়া হলে মাঠপর্যায়ের সেবা আকর্ষণীয় হবে। শুধু চিকিৎসক নিয়োগ করলেই হবে না; নার্স, ফার্মাসিস্ট, টেকনোলজিস্ট, অ্যানেসথেশিয়া টিম, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও প্রশাসনিক জনবলসহ পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে হবে।

ডিজিটাল উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, টেলিমেডিসিন এবং কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক স্বাস্থ্যসেবার স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, নৈতিকতা প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পারস্পরিক দায়িত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ

শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। চিকিৎসকদের দায়িত্ব নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করা। প্রশাসনের দায়িত্ব প্রয়োজনীয় পরিবেশ, জনবল ও তদারকি নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো পেশার পরিচয় হিসেবে তুলে না ধরে তথ্যনির্ভর আলোচনা করা। আর নাগরিকদের দায়িত্ব চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা বুঝে আইনসঙ্গত উপায়ে অভিযোগ জানানো।

একটি সন্তুষ্ট, দক্ষ, নিরাপদ এবং জবাবদিহিমূলক চিকিৎসক সমাজই জনগণকে মানসম্মত সেবা দিতে পারে। চিকিৎসকদের জন্য ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি দেশের প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। চিকিৎসককে টিকিয়ে রাখতে পারলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও মানবিক, কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব হবে।

লেখক: ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, সিনিয়র কনসালটেন্ট- রেডিয়েশন অনকোলজি, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .