বিশেষায়িত জাতীয় ইনস্টিটিউটে অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি সেবা: হতে পারে বাংলাদেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল রেডিওথেরাপি সুবিধা এবং বিশেষায়িত ক্যান্সারসেবার ঘাটতি। দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আধুনিক রেডিওথেরাপি কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সমন্বিত অনকোলজি সেবার সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অনেক রোগীকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হয় এবং কখনো কখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতেই উল্লেখযোগ্য সময় লেগে যায়।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর পাশাপাশি আমাদের ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটগুলোকেও আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। দেশে নাক-কান-গলা ও হেড-নেক, নিউরোসায়েন্স, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, কিডনি ও ইউরোলজি, বক্ষব্যাধি, অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট অঙ্গের বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অনকোলজি এবং বিশেষ করে রেডিয়েশন অনকোলজি সেবা নেই।
সরকার চাইলে পর্যায়ক্রমে এসব ইনস্টিটিউটে সাইট-স্পেসিফিক অনকোলজি ইউনিট গড়ে তুলতে পারে। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানটি যে রোগের জন্য বিশেষায়িত, সেখানে সংশ্লিষ্ট ক্যান্সারের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। যেমন হেড অ্যান্ড নেকভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে Head & Neck Oncology, নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে Neuro-Oncology, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ইনস্টিটিউটে GI Oncology এবং ইউরোলজি বা কিডনি ইনস্টিটিউটে Uro-Oncology সেবা চালু করা যেতে পারে। রোগীর সংখ্যা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে আধুনিক রেডিওথেরাপি সুবিধাও যুক্ত করা সম্ভব।
এই মডেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে রোগীর জন্য। একজন ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হয় সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদসহ একটি multidisciplinary team-এর। একই প্রতিষ্ঠানে এসব সেবা থাকলে রোগীর চিকিৎসা দ্রুত, সমন্বিত এবং কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করা যায়। রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে বারবার যেতে হয় না।
বিশ্বের উন্নত ক্যান্সারসেবায় এই organ-based বা site-specific approach বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যে ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা সাধারণত disease-specific multidisciplinary team-এর মাধ্যমে পরিকল্পিত হয়। সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে radiation oncologist-রাও নির্দিষ্ট কয়েকটি tumour site নিয়ে বেশি কাজ করেন। এর ফলে চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায় এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় বিশেষ দক্ষতা তৈরি হয়। বাংলাদেশেও এই ধারণাকে আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এর দ্বিতীয় বড় সুফল হবে বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরি। একজন চিকিৎসক যখন একটি নির্দিষ্ট ক্যান্সারের বিপুলসংখ্যক রোগী নিয়মিত দেখেন, তখন সেই রোগের diagnosis, staging, treatment planning, radiotherapy contouring, toxicity management এবং follow-up নিয়ে তার দক্ষতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে, একজন radiation oncologist যদি নিয়মিত কয়েকশ head and neck cancer অথবা brain tumour রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই ওই ক্ষেত্রে তার একটি উচ্চ পর্যায়ের subspecialty expertise তৈরি হওয়া সম্ভব।
এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতাকেও পদায়নের সময় গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। যিনি neuro-oncology নিয়ে কাজ করতে চান, তাকে neurosciences-based oncology programme-এ যুক্ত করা যেতে পারে। যিনি head and neck, GI বা uro-oncology-তে আগ্রহী, তাকে সংশ্লিষ্ট specialised institute-এ কাজের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে চাকরির সন্তুষ্টি, দক্ষতা এবং সেবার মান বাড়বে।
তৃতীয় এবং দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ লাভ হবে গবেষণা ও বাংলাদেশের নিজস্ব ক্যান্সার ডেটা তৈরি। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিলে structured database, clinical audit, treatment outcome analysis এবং prospective research চালানো সহজ হয়। এসব গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারব বাংলাদেশের রোগীরা কোন পর্যায় -এ আসছেন, কোন চিকিৎসায় কী ফল হচ্ছে, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কেমন, treatment interruption কতটা এবং কোন পদ্ধতি আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে cost effective ।
এই তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক guideline অনুসরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী নিজস্ব cancer treatment protocol এবং resource-adapted guideline তৈরি করা সম্ভব হবে। এটাই একটি দেশের টেকসই ক্যান্সারসেবার অন্যতম ভিত্তি।
তবে প্রতিটি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটে একসঙ্গে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করার প্রয়োজন নেই। প্রথমে national needs assessment করে উচ্চ রোগীসংখ্যার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে pilot centre হিসেবে নির্বাচন করা যেতে পারে। সেখানে oncology department, tumour board, registry এবং প্রয়োজন অনুযায়ী LINAC-ভিত্তিক radiotherapy facility স্থাপন করা যেতে পারে। সফল হলে পর্যায়ক্রমে মডেলটি অন্যান্য ইনস্টিটিউট ও বিভাগীয় শহরে সম্প্রসারণ করা যাবে।
বাংলাদেশের ক্যান্সারসেবার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন ভবন বা নতুন মেশিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বিশেষজ্ঞ দল তৈরি, রোগভিত্তিক চিকিৎসা কাঠামো এবং গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
সরকার যদি আমাদের জাতীয় বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটগুলোকে ধীরে ধীরে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করে তোলে, তাহলে একই উদ্যোগে রোগীর চিকিৎসা সহজ হবে, রেডিওথেরাপির সক্ষমতা বাড়বে, site-specific specialist তৈরি হবে এবং দেশের নিজস্ব ক্যান্সার গবেষণার ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
এটি শুধু আরেকটি স্বাস্থ্য প্রকল্প নয়। এটি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবসম্মত জাতীয় ক্যান্সারসেবা কৌশল।

