Logo
Logo
×
   

ডাক্তার আছেন

শিশুদের কান পাকা: কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধে যা জানা জরুরি

Icon

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

শিশুদের কান পাকা: কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধে যা জানা জরুরি

শিশুর কান দিয়ে বারবার পানি, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়াকে আমরা সাধারণভাবে ‘কান পাকা’ বলে থাকি। এটি শিশুদের একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা। এর পেছনে থাকতে পারে মধ্যকর্ণের সংক্রমণ, কানের পর্দায় ছিদ্র, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কিংবা নাক ও গলার কোনো সমস্যার প্রভাব।

যেকোনো বয়সেই কানের সংক্রমণ হতে পারে। তবে শিশুদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বারবার সর্দি-কাশি হওয়া, নাকের সমস্যা এবং এডেনয়েড বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে শিশুর মধ্যকর্ণের সমস্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

কেন শিশুদের কান পাকে?

শিশুদের কানের সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইউস্টেশিয়ান টিউব (Eustachian tube)। 

এটি মধ্যকর্ণকে নাকের পেছনের অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এর প্রধান কাজ হলো মধ্যকর্ণে বাতাসের চাপের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মধ্যকর্ণে জমে থাকা তরল নিষ্কাশনে সহায়তা করা।

শিশুদের ইউস্টেশিয়ান টিউব প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট, সরল ও অনুভূমিক অবস্থানে থাকে। ফলে নাক ও গলার সংক্রমণ বা ফোলাভাবের কারণে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম সহজেই ব্যাহত হতে পারে।

ঘন ঘন সর্দি-কাশি কেন কানের সমস্যা বাড়ায়?

শিশুদের ঘন ঘন সর্দি-কাশি হলে শুধু নাক ও গলাতেই সমস্যা হয় না, এর প্রভাব মধ্যকর্ণেও পড়তে পারে। সর্দি-কাশির সময় নাক ও নাকের পেছনের অংশের শ্লেষ্মা ঝিল্লি ফুলে যায়। এতে ইউস্টেশিয়ান টিউবের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

ইউস্টেশিয়ান টিউব মধ্যকর্ণে বাতাস চলাচল ও চাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মধ্যকর্ণে জমে থাকা তরল নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নালির কার্যকারিতা ব্যাহত হলে মধ্যকর্ণে তরল জমে যেতে পারে। পরবর্তীতে সেই তরলে জীবাণুর সংক্রমণ হলে মধ্যকর্ণের প্রদাহ বা ‘Otitis Media’ হতে পারে।

এ কারণেই অনেক শিশুর সর্দি-কাশির কয়েক দিন পর কান ব্যথা, জ্বর, কান বন্ধ লাগা বা শুনতে কম পাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কানের পর্দায় ছিদ্র তৈরি হলে কান দিয়ে পানি বা পুঁজও বের হতে পারে।

তাই শিশুর ঘন ঘন সর্দি-কাশির সঙ্গে যদি বারবার কানের সমস্যা দেখা দেয়, বিষয়টি শুধু সাময়িক সর্দি-কাশি হিসেবে না দেখে নাক, কান ও গলার সামগ্রিক সমস্যা হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শিশুদের কান পাকা প্রতিরোধে বুকের দুধ খাওয়ানোর ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—বুকের দুধ শিশুর কানের সংক্রমণের কারণ নয়; বরং বুকের দুধ শিশুর বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

তবে শিশুকে সম্পূর্ণ চিৎ করে বা সমতল অবস্থায় শুইয়ে দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। খাওয়ানোর সময় দুধ বা তরল নাক-গলার পেছনের দিকে উঠে গেলে ইউস্টেশিয়ান টিউবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

তাই শিশুকে কোলে নিয়ে মাথা ও শরীর কিছুটা উঁচু রেখে সঠিক ভঙ্গিতে বুকের দুধ খাওয়ানো ভালো অভ্যাস।

কান পাকা সমস্যার পেছনে এডেনয়েড বড় হয়ে যাওয়ার ভূমিকা

শিশুর নাকের পেছনে থাকা এডেনয়েড (Adenoid) হলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক লিম্ফয়েড টিস্যু। তবে কোনো কোনো শিশুর এডেনয়েড অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, নাক ডাকা এবং ঘন ঘন নাক বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ইউস্টেশিয়ান টিউবের মুখের আশপাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

এর ফলে মধ্যকর্ণে চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেখানে তরল জমতে পারে এবং ‘Otitis Media with Effusion (OME)’ বা মধ্যকর্ণে পানি জমার সমস্যা হতে পারে।

দীর্ঘদিন মধ্যকর্ণে পানি জমে থাকলে শিশুর শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শিশুর কথা বলা ও ভাষা শেখার ওপরও পড়তে পারে।

শিশুদের কান পাকা: প্রতিকার ও করণীয়

শিশুর কান দিয়ে পানি বা পুঁজ পড়লে নিজের ইচ্ছায় কানে ড্রপ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রয়োজনে কানের পর্দায় ছিদ্র আছে কি না, মধ্যকর্ণে পানি বা পুঁজ জমেছে কি না এবং শিশুর শ্রবণশক্তিতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না—এসব পরীক্ষা করা হতে পারে।

শুধু বারবার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সংক্রমণ সাময়িকভাবে কমিয়ে দিলেই সব সময় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। শিশুর ঘন ঘন সর্দি-কাশির কারণ, নাকের অ্যালার্জি, এডেনয়েড বড় হয়ে যাওয়া কিংবা ইউস্টেশিয়ান টিউবের কার্যকারিতার সমস্যাও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

শিশুর—

বারবার কান পাকা বা কান দিয়ে পানি/পুঁজ পড়া;

কান বন্ধ লাগা;

শুনতে কম পাওয়া;

টিভির শব্দ অস্বাভাবিক বেশি করে শোনা;

ডাকলে সাড়া দিতে দেরি করা;

কথা বলা বা ভাষা শেখায় বিলম্ব দেখা দেওয়া—

এসবের কোনোটি থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মনে রাখবেন

শিশুর কান, নাক ও গলা আলাদা অঙ্গ হলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ শারীরবৃত্তীয় সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিশুর বারবার কান পাকার ক্ষেত্রে শুধু কান নয়—নাক, ইউস্টেশিয়ান টিউব ও এডেনয়েডের সমস্যাও গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।

লেখক: এফসিপিএস (ইএনটি), সহকারী অধ্যাপক (ইএনটি), সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .