মহাসাগরের চরিত্রে বড় পরিবর্তনের শঙ্কা, নতুন বিপদের মুখে গোটা বিশ্ব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আটলান্টিক মহাসাগরের চরিত্রে বড় পরিবর্তনের শঙ্কায় প্রমাদ গুণছেন বিজ্ঞানীরা। এই মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র স্রোত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। নতুন এক গবেষণায় এই কথা উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব জলবায়ু মডেল সবচেয়ে বড় বিপদের কথা বলছে, সেগুলোই বাস্তবের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে। এই খবর বিজ্ঞানীদের কাছে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’।
এই সমুদ্র স্রোতের নাম হলো অ্যাটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন, সংক্ষেপে অ্যামক। এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার একটি বড় অংশ। ইতিমধ্যে জানা গেছে, গত ১,৬০০ বছরের মধ্যে এই স্রোত এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে। জলবায়ু সংকটের কারণেই এটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। ২০২১ সালে বিজ্ঞানীরা এর মধ্যে বিপদের সংকেত দেখতে পান।
অ্যামক উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পানিকে ইউরোপ ও আর্কটিকে নিয়ে যায়। সেখানে পানি ঠান্ডা হয়ে নিচে ডুবে গিয়ে একটি গভীর ফেরত স্রোত তৈরি করে। এই স্রোত ভেঙে পড়লে অনেক বড় বিপদ হবে। কোটি কোটি মানুষ যে বৃষ্টির উপর নির্ভর করে চাষ করে, সেই বৃষ্টির গতিপথ বদলে যাবে। পশ্চিম ইউরোপে ভয়াবহ শীত ও খরা দেখা দেবে। আটলান্টিক মহাসাগরের আশেপাশে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৫০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে।
অন্যান্য মহাদেশেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে চলেছে। লাতিন আমেরিকায় এর ফলে অতিবৃষ্টি দেখা দেবে। ৪৩.৮ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে বৃষ্টিপাত। তবে তার বিপরীত চিত্রের দেখা মিলবে পশ্চিম আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়। পশ্চিম এশিয়ায় আরও বেশি খরা দেখা দেবে, ২৯.১ শতাংশ কমবে বৃষ্টিপাত। দক্ষিণ এশিয়ায় ১৮.৮ শতাংশ বৃষ্টি কমে যাবে, যার ফলে বর্ষাকাল আরও ছোট হয়ে আসবে বলে জানাচ্ছে অ্যাডভান্সিং আর্থ অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা।
বিজ্ঞানীরা অনেক ধরনের কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে ভবিষ্যতের জলবায়ু যাচাই করেন। কিন্তু অ্যামকের ক্ষেত্রে এই মডেলগুলো একেক রকম ফলাফল দিচ্ছে। কেউ বলছে ২১০০ সালের মধ্যে স্রোত আর কমবে না। কেউ বলছে এটি ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমনকি যদি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কমিয়ে কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা হয়, তবুও।
নতুন গবেষণায় বাস্তব সমুদ্রের পর্যবেক্ষণ এবং কম্পিউটার মডেলকে একসাথে মেলানো হয়েছে। এতে ২১০০ সালের মধ্যে অ্যামকের গতি ৪২ থেকে ৫৮ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা গেছে। এই মাত্রার পতন প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভেঙে পড়ার দিকে নিয়ে যাবে।
ফ্রান্সের ইনরিয়া সেন্টার ডি রেশার্শ বোর্দো সুদ-ওয়েস্টের গবেষক ড. ভ্যালেন্টিন পোর্টম্যান এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে সব জলবায়ু মডেলের গড় ধারণার চেয়ে অ্যামক আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে। এর মানে হলো অ্যামক একটি টার্নিং পয়েন্টের আরও কাছে আছে।’
জার্মানির পটসডাম ইন্সটিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের অধ্যাপক স্টেফান র্যামস্টর্ফ বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক ফলাফল। এটি দেখাচ্ছে যে যেসব মডেলকে আগে ‘হতাশাবাদী’ ভাবা হতো, ২১০০ সালের মধ্যে অ্যামকের বড় দুর্বলতার কথা বলে যেগুলো, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলোই বাস্তবসম্মত। কারণ সেগুলো পর্যবেক্ষণের তথ্যের সঙ্গে বেশি মিলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। আমার মনে হচ্ছে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই আমরা সেই বিন্দু পার হয়ে যেতে পারি, যেখান থেকে অ্যামক বন্ধ হওয়া আর ঠেকানো সম্ভব হবে না। এটি অনেক কাছের কথা।’
র্যামস্টর্ফ ৩৫ বছর ধরে অ্যামক নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বারবার বলে আসছেন অ্যামক ভেঙে পড়া ‘যেকোনো মূল্যে’ এড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি এই কথা তখনও বলেছিলাম, যখন আমরা ভাবতাম অ্যামক বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা হয়তো ৫ শতাংশ। তখনও বলেছিলাম এই ঝুঁকি অনেক বেশি, কারণ এর ক্ষতি হবে বিশাল। আর এখন মনে হচ্ছে সেই আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি। পৃথিবীর ইতিহাসে গত ১ লাখ বছরে সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর জলবায়ু পরিবর্তনগুলো ঘটেছে যখন অ্যামক অন্য একটি অবস্থায় চলে গেছে।’
অ্যামক দুর্বল হচ্ছে কারণ জলবায়ু উষ্ণতার কারণে আর্কটিকের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এতে সেখানে সমুদ্রের পানি আর আগের মতো দ্রুত ঠান্ডা হচ্ছে না। উষ্ণ পানি ঘন নয়, তাই সেটি ধীরে ধীরে গভীরে নামে। এতে লবণাক্ত পানিতে বৃষ্টির পানি জমতে থাকে। এই পানিও হালকা হয়ে যায় এবং গভীরে নামা আরও কমে। এইভাবে একটি চক্র তৈরি হয় যা অ্যামককে আরও দুর্বল করে দেয়।
এই গবেষণাটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় চারটি আলাদা পদ্ধতিতে বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও মডেল যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘রিজ রিগ্রেশন’ নামে একটি পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো ফলাফল দিয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানে এটি আগে তেমন ব্যবহার হয়নি।
গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ আটলান্টিকে পানির লবণাক্ততা ঠিকমতো প্রতিফলিত করে এমন মডেলগুলো বেশি নির্ভরযোগ্য। এটি জানা ছিল যে দক্ষিণ আটলান্টিকের লবণাক্ততা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই গবেষণার কাজকে র্যামস্টর্ফ ‘অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য’ বলেছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ কম্পিউটার মডেলগুলো গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার পানিকে হিসেবে নেয়নি। সেই গলা পানিও সমুদ্রকে মিষ্টি করে দিচ্ছে। র্যামস্টর্ফের ভাষায়, ‘এটি একটি অতিরিক্ত কারণ যা বোঝাচ্ছে যে বাস্তবতা সম্ভবত আরও খারাপ।’
সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান



