Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ, ইরান কি এবার নতিস্বীকার করবে?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০১ পিএম

ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ, ইরান কি এবার নতিস্বীকার করবে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের বেশি সময় বাকি। ইরান এই রাজনৈতিক সময়কে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নতুন কৌশল নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার সামরিক হামলার পরিবর্তে দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলে ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে ট্রাম্প এই কৌশলে কতদিন অটল থাকবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বুধবার (১৯ আগস্ট) সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে সামরিক হামলা চালিয়েও সফল না হওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনায় ফেরাতে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েও ফল না পাওয়ার পর ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনাকে অনেকটা মুখরক্ষার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে ইরান ইস্যুতে মার্কিন নীতিতে একের পর এক পরিবর্তন ও কৌশলগত অবস্থান বদল দেখা গেছে।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক মিত্রদের জানিয়েছে, তিনি এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের দিকে এগোচ্ছেন। তার ধারণা, এই চাপ ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেশটির সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে।

বুধবার ট্রাম্প বলেন, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি খুবই ভালো। যদিও এর আগে কয়েক দিনের যুদ্ধের পর তিনি সংঘাতকে বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, বর্তমানে সেই সংঘাত ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে।

পরে আরেকটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, যেসব দেশের ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দিচ্ছে, তাদের তা বন্ধ করতে হবে। তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন ও ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছু বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

তবে ইরান এত সহজে চাপে নতিস্বীকার করবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইরান কয়েক দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে আছে।

ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা ড্যানিয়েল সিত্রিনোভিচ মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ওপর বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু এতে দেশটির কৌশল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তার মতে, ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন হলেও শুধু চাপের কারণে দেশটির নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ বদলাবে—এমন কোনো লক্ষণ নেই।

ট্রাম্পকে কী পরিবর্তন করতে হবে?

ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লাগতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নে যে ধরনের ধৈর্য প্রয়োজন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ইরানও ধরে নিতে পারে, পরিকল্পনার ফল আসার আগেই ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপের কৌশল থেকে সরে আসবেন।

এ ছাড়া কার্যকর অর্থনৈতিক অবরোধের জন্য কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। ইরানের জাহাজ ও বন্দরকে অবরোধ করতে সামরিক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে হোয়াইট হাউস। কিন্তু ইরানকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হলে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কিছু সুযোগ অবশ্য রয়েছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুডোভিক হুড ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের আয় কমাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি।

চীনের ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এসব ব্যাংক ইরানের অবৈধ তেল বিক্রির লেনদেনে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে ওই সফরের আগে চীনের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে তিনি কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কি পরিকল্পনায় অটল থাকবেন ট্রাম্প

ট্রাম্প অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইলেও ইরানের হাতে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের বেশি সময় বাকি। ইরান এই রাজনৈতিক সময়কে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত করতে ইরান ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে মার্কিন ভোটারদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষও তীব্র হতে পারে।

ট্রাম্প পালটা হামলা চালালে সংকট আরও বাড়বে, আর চুপ থাকলে তাকে দুর্বল দেখাতে পারে। ফলে সামরিক যুদ্ধ হোক বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ—দুই ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরাও বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমস ওয়াকিনশ বলেন, তিনি এমন অর্থনৈতিক যুদ্ধে আগ্রহী নন, যেখানে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মূল্য মার্কিন জনগণকে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের মাধ্যমে দিতে হবে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ হুঁশিয়ারির পরও ইরান সংকটের কোনো স্পষ্ট সমাধান এখনো দেখা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা কি ইরানের সরকারের আগে মার্কিন জনগণের শেষ হয়ে যাবে?

সূত্র: সিএনএন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .