আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার
কেন ইসরাইলের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে গ্রিস?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
ইসরাইলের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের একটি বিশাল আকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে গ্রিস।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ইউরোপীয় সতর্কতাকে পাশ কাটিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের একটি বিশাল আকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে গ্রিস। এটি উভয় দেশের মধ্যে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি।
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) তেল আবিবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক যখন দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে এই চুক্তি হলো।
একই সঙ্গে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন এবং অবরুদ্ধ পশ্চিম তীর গ্রাস করার ক্রমবর্ধমান চেষ্টার পর ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে ইউরোপের সামগ্রিক সতর্ক অবস্থানকেও ভেঙে দিয়েছে এই চুক্তি।
উল্লেখ্য, গ্রিস ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে আসছে।
এই নতুন চুক্তিটি ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিসের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনার একটি অংশ। গ্রিস ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—যা দেশটিতে ‘আচিলিস শিল্ড’ নামে পরিচিত—গড়ে তুলতে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও ফ্রান্স ও ইতালি থেকে ফ্রিগেট কিনতে ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ইউরো (৩২ বিলিয়ন ডলার) খরচ করবে।
তিন বছর ধরে আলোচনার পর ‘আচিলিস শিল্ড’ ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে। ৩৫ মাসের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ অপারেশনাল বা কার্যক্রমের উপযোগী হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুযায়ী, আচিলিস শিল্ডে তিনটি মূল সিস্টেম রয়েছে:
ডেভিডস স্লিং: ইসরাইল মিসাইল ডিফেন্স অর্গানাইজেশন কর্তৃক এটি বিকশিত হয়েছে। এটি একটি উন্নত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সরাসরি কাইনেটিক ইমপ্যাক্টের মাধ্যমে কৌশলগত ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং মাঝারি থেকে দীর্ঘ পাল্লার রকেট প্রতিহত করতে নকশা করা হয়েছে। এটি সুপারসনিক গতিতে চলে এবং ৪০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার (২৫ থেকে ১৮৫ মাইল) দূর থেকে হুমকি মোকাবিলা করতে পারে।
দ্য স্পাইডার: রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস দ্বারা এটি তৈরি করা হয়েছে। এই সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেমটি বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং গাইডেড যুদ্ধাস্ত্রের মতো কম উচ্চতার আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা করার জন্য তৈরি।
দ্য বারাক এমএক্স: ইসরাইল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বারা নির্মিত এই বহু-মডাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি চারটি ইন্টারসেপ্টর মডেল ব্যবহার করে ৩৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৫৫ থেকে ২৪০ মাইল) দূর থেকে ক্রুজ মিসাইল, ব্যালিস্টিক মিসাইল, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি) সহ বিস্তৃত পরিসরের হুমকি মোকাবিলা করতে পারে।
চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরাইল আকাশ নজরদারির জন্য মাল্টি-মিশন রাডার এবং সমস্ত প্রযুক্তিকে একীভূত করে এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কমান্ড সেন্টারও সরবরাহ করবে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের বিবৃতি অনুযায়ী, ২৬ মিলিয়ন ইউরো (৩০ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি অতিরিক্ত চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল গ্রিসকে ড্রোন ডোম সিস্টেমও বিক্রি করবে।
কেন এই চুক্তি এখনই হচ্ছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের ফলে উদ্ভূত হুমকি নিয়ে গ্রিস ক্রমবর্ধমানভাবে উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে তেহরান যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
গ্রিসে নিযুক্ত অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নীতি বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে যে গ্রিস মার্কিন নৌঘাঁটিগুলোর স্বাগতিক দেশ এবং ভবিষ্যতে এগুলো ইরানিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান যখন তাদেরও হুমকি দিচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে গ্রিস এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।’
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তবুও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইসরাইলের ডেভিডস স্লিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, যা সস্তা এবং অধিক কার্যকর, বলেন পুসতাই। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই মারাত্মকভাবে প্যাট্রিয়ট সংকটে ভুগছে। গত মে মাসে সুইজারল্যান্ডকে জানানো হয়েছিল যে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্যাট্রিয়ট সরবরাহে বিলম্ব হবে এবং খরচও বেশি পড়বে।
তুরস্কের জন্য এর অর্থ কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্কের বর্ধিত ড্রোন সক্ষমতা নিয়েও গ্রিস সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আঙ্কারা ও এথেন্স দীর্ঘদিন ধরে এজিয়ান সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিতর্কিত এলাকার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। এ ছাড়া গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যকার উত্তেজনাও বাড়ছে।
পুসতাই যোগ করেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি একটি কারণ যার জন্য (গ্রিস) এজিয়ান সাগরে আচিলিস শিল্ডের প্রথম উপাদানগুলো মোতায়েন করবে।’
তুরস্ক অবশ্য এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে গ্রিস, ইসরাইল এবং সাইপ্রাসের (যাদের সঙ্গেও তুরস্কের আঞ্চলিক সীমানা বিরোধ রয়েছে) মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক অতীতে আঙ্কারার কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ডেকে এনেছিল।
এথেন্স থেকে আল জাজিরার জন সাইরাপুলোস বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে কিছু তুর্কি বিশ্লেষককে তুর্কি মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে শুনছি যে, ইসরাইলের কাছ থেকে গ্রিসের এই অস্ত্র সংগ্রহের চুক্তিটি দখলকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরাইলের করা সমস্ত কাজের জন্য গ্রিসকেও কার্যকরভাবে সম-অংশীদার করে তুলেছে।’
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরে সাইপ্রাসই প্রথম ইসরাইলের বারাক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছিল। সে সময় তুরস্ক থেকে এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ মতবাদের প্রধান প্রবক্তা এবং বিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল জেম গুরদেনিজ বলেছিলেন, ‘গ্রিক সাইপ্রাস প্রশাসন এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সম্পূর্ণ প্রক্সিতে পরিণত হয়েছে।’
গ্রিসে ইসরাইল নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া?
অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো গ্রিসের অনেক মানুষও গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন এবং দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার তীব্র বিরোধী।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুনে প্রকাশিত এক জরিপ অনুসারে, প্রায় ৭৬ শতাংশ গ্রিক নাগরিক মনে করেন না যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্ব রাজনীতির বিষয়ে সঠিক কাজটি করবেন।
গ্রিসের বিরোধী দলের নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিসের সঙ্গে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের কড়া সমালোচনা করেছেন এবং ইসরাইল তাদের দেশকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।
গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস গত সপ্তাহে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে লিখেছেন, ‘ইসরাইলি স্যাটেলাইটে গ্রিসের রূপান্তর মারাত্মক গতিতে এগিয়ে চলেছে। এটি অধিকাংশ গ্রিক নাগরিকের জন্য, আমাদের অঞ্চলের শান্তির জন্য এবং বৃহত্তর ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার জন্য অশুভ সংকেত। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

