অমর জ্ঞানের প্রাসাদ
১০৮৬ বছরে আল আজহারের ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রভাব
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৩ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো সময়ের সীমা অতিক্রম করে প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
মিসরের আল আজহার শরীফ তেমনই এক আলোকস্তম্ভ, যার ১০৮৬ বছরের পথচলা কেবল একটি মসজিদের স্থাপত্যগাথা নয়, বরং জ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্বের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
কায়রো নগর প্রতিষ্ঠার এক বছর পর, ৩৫৯ হিজরিতে ফাতেমীয় শাসনামলে শুরু হয় আল আজহারের নির্মাণকাজ। প্রায় ২৭ মাস পর ৩৬১ হিজরির ৭ রমজান, ৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন, শুক্রবার এখানে প্রথম জুমার জামাত আদায় করা হয়। সেই দিনটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, সেটিই হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ জ্ঞানযাত্রার সূচনা।
প্রথমদিকে এটি ছিল একটি জামে মসজিদ, কিন্তু অচিরেই তা রূপ নেয় শিক্ষা ও বৌদ্ধিক চর্চার কেন্দ্রে। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব ও দর্শনের পাঠচক্র থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো আল আজহার ধীরে ধীরে বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে ফাতেমীয়, আইয়ুবীয়, মামলুক ও উসমানি আমলে এর সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠন অব্যাহত ছিল। প্রতিটি যুগ যুক্ত করেছে নতুন মিনার, নতুন প্রাঙ্গণ, নতুন স্থাপত্যরীতি। বর্তমানে মসজিদে রয়েছে ৬টি মিহরাব, ১টি ঐতিহাসিক মিম্বর, ৮টি প্রবেশদ্বার ও ৫টি মিনার।
প্রায় ১২ হাজার বর্গমিটার বিস্তৃত এই স্থাপনায় ৩৮০টিরও বেশি মার্বেল স্তম্ভ বিভিন্ন যুগের নির্মাণ ঐতিহ্য বহন করছে। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সংস্কার সম্পন্ন হয় ১৪৩৯ হিজরি (২০১৮ সাল), যেখানে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আধুনিক পুনরুদ্ধার প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়।
স্থাপত্যের সীমা পেরিয়ে আল আজহার আজ একটি বৈশ্বিক বৌদ্ধিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র। এর বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো, গবেষণা পরিষদ ও ফতোয়া বোর্ড মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মীয় ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের শিক্ষার্থীরা এখানে অধ্যয়ন করতে এসে একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, আল আজহারের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে এর অভিযোজনক্ষমতা ও মধ্যপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি। রাজনৈতিক পালাবদল, ঔপনিবেশিক প্রভাব কিংবা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার সবকিছুর মধ্যেও এটি জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
সমসাময়িক বিশ্বে চরমপন্থা ও মতাদর্শিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে আল আজহার নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সংলাপনির্ভর ইসলামী চিন্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
১০৮৬ বছরের এই উদযাপন তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিকী নয়, এটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের পুনর্নিশ্চিতকরণ। যে প্রাঙ্গণে একদিন প্রথম জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই প্রাঙ্গণ আজও জ্ঞান ও ঈমানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে অবিনশ্বর, অবিচল, ঐতিহাসিক।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

