Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

ফেরেশতাদের পাহাড়, বালুর বুকে নেমে আসা আসমানি সাহায্যের নীরব সাক্ষ্য

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

ফেরেশতাদের পাহাড়, বালুর বুকে নেমে আসা আসমানি সাহায্যের নীরব সাক্ষ্য

বদরের প্রান্তর ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য মোড়। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন থেমে গেছে কোনো এক গভীর মুহূর্তে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা রুক্ষ পাহাড়, ধূসর পাথরের স্তব্ধতা সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ চোখে পড়ে এক ভিন্ন সত্তা, এক আলাদা দৃশ্যমানতা জাবালে মালায়িকাহ্। 

এই পাহাড়কে দেখলেই বোঝা যায়, এটি অন্যদের মতো নয়। আশেপাশের পাহাড়গুলো শক্ত পাথরের, কঠিন ও অনমনীয়। অথচ জাবালে মালায়িকাহ্ যেন বালুর কোমলতায় গড়া লালচে আভায় মোড়া, সূর্যের আলোয় যার রঙ কখনো রক্তিম, কখনো সোনালি-লাল। 

দূর থেকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর ভিন্নতা, যেন প্রকৃতি নিজেই একে আলাদা করে রেখেছে কোনো বিশেষ স্মৃতির জন্য। 

আমি যখন এই পাহাড়ে উঠি, তখন মনে হয় আমি আর বর্তমানের মানুষ নই, আমি যেন হেঁটে যাচ্ছি ইতিহাসের গভীর এক স্তরের ভেতর দিয়ে। প্রতিটি পদক্ষেপে পা বালুর ভেতরে ডুবে যায়, ধীরে ধীরে, নরমভাবে—যেন এই মাটি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলছে, “অনুভব করো, তাড়াহুড়ো করো না।” 

এই বালুর স্পর্শে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নেয় যেন আমি কোনো সাধারণ মাটিতে নয়, বরং এমন এক জমিনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একদিন আসমান ও জমিনের সংযোগ ঘটেছিল। বদরের সেই দিন যেদিন অল্পসংখ্যক মুমিনের দল দাঁড়িয়েছিল এক প্রবল শক্তির সামনে, আর তাদের চোখের অশ্রু ও দোয়া ছুঁয়ে গিয়েছিল আরশকে। 

কুরআন সেই মুহূর্তকে অমর করে রেখেছে, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে, তখন তিনি সাড়া দিয়েছিলেন—আমি তোমাদের সাহায্য করব ধারাবাহিকভাবে আগত এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা। (সূরা আনফাল ৯) 

এই আয়াত শুধু একটি ঘোষণা নয়, এটি এক জীবন্ত বাস্তবতা, যা বদরের ময়দানে প্রতিফলিত হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম রা. এর বর্ণনায় পাওয়া যায় তাঁরা এমন আঘাত দেখেছেন, যা মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, এমন অশ্বারোহী দেখেছেন, যারা দৃশ্যমান হলেও মানবীয় ছিল না। 

এই প্রেক্ষাপটেই “জাবালে মালায়িকাহ্” ফেরেশতাদের পাহাড় নামটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। যদিও ইতিহাসের গ্রন্থে এই নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত কোনো ভূগোলিক পরিভাষা হিসেবে সর্বত্র উল্লেখিত নয়, তবুও বদরের প্রান্তরের এই বিশেষ অংশটি মুসলিম চেতনায় এক আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। 

এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে বোঝা যায় এটি কেবল একটি স্থান নয়, এটি এক অনুভবের কেন্দ্র। বাতাসে এক ধরনের নীরবতা, যা শব্দের চেয়ে বেশি উচ্চারণ করে। মনে হয়, এখানে এখনো প্রতিধ্বনিত হয় সেই দিনের আহ্বান, সেই দোয়া, সেই আসমানী সাহায্যের নিঃশব্দ উপস্থিতি। 

পায়ের নিচের বালু ধীরে ধীরে সরে যায়, আর মনে হয় আমার ভেতর থেকেও যেন অনেক কিছু সরে যাচ্ছে। অহংকার, ব্যস্ততা, দুনিয়ার অস্থিরতা সব যেন ঝরে পড়ে। তার জায়গায় জন্ম নেয় এক গভীর প্রশান্তি, এক অদৃশ্য শক্তির প্রতি নির্ভরতার অনুভব। 

সূর্যের আলো যখন এই লালচে বালুর ওপর পড়ে, তখন মনে হয় এই রঙ শুধুই মাটির নয়, এটি ইতিহাসেরও। এতে মিশে আছে সংগ্রামের স্মৃতি, দোয়ার অশ্রু, আর বিজয়ের নিঃশব্দ ঘোষণা। 

এই জাবালে মালায়িকাহ্ কেবল একটি পাহাড় নয়, এটি এক জীবন্ত দলিল যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা একসূত্রে গাঁথা। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে শেখে দুনিয়ার দৃশ্যমান শক্তির বাইরে আরেকটি অদৃশ্য জগত রয়েছে, যেখানে বিজয় নির্ধারিত হয় ঈমান, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসের মাধ্যমে। 

পাহাড়টি যেন নীরবে ফিসফিস করে বলে যায় ইতিহাস শুধু পড়ে বোঝা যায় না, কখনো কখনো তা হেঁটে অনুভব করতে হয়। আর সেই অনুভবই মানুষকে বদলে দেয় নীরবে, গভীরভাবে, চিরদিনের জন্য। 

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .