Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

এক নীরব সাধকের গল্প

Icon

মিজানুর রহমান আরমানী

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

এক নীরব সাধকের গল্প

মাওলানা নুরুল হুদা।

এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলে হৃদয়ের ভেতর এক ধরনের প্রশান্তি নেমে আসে। তারা প্রচারের আলোয় হাঁটেন না, সংবাদপত্রের শিরোনামও হন না; অথচ তাদের নীরব পদচারণায় বদলে যায় অসংখ্য মানুষের জীবন। 

তারা নিজেরা ইতিহাস লিখতে বসেন না, বরং মানুষ গড়ে এমন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন—যা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে। তেমনই এক নীরব আলোর নাম— মাওলানা নুরুল হুদা।

১৯৬০ সালের ২৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বরপাড়া গ্রামে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই ইলম ও তাকওয়ার প্রতি ছিল তার গভীর ঝোঁক। সাধারণ জীবনযাপন, বিনয়ী স্বভাব আর নীরব মেহনত—এই তিন গুণই তাকে আলাদা করে তুলেছিল।

কিছু মানুষ আকাশের তারার মতো—দূর থেকে শুধু জ্বলজ্বল করেন। আর কিছু মানুষ সূর্যের মতো—নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দেন। মাওলানা নুরুল হুদা ঠিক তেমনই একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।

একদিন হয়তো ছোট্ট একটি স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবতার মহীরুহ। ২০০৩ সালে তিনি লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন আমিরুল মুমিনীন কওমি মাদ্রাসা।  

এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি অসংখ্য ছাত্রের স্বপ্নের ঠিকানা, অসহায়দের আশ্রয়, দ্বীনি শিক্ষার এক উজ্জ্বল বাতিঘর। আর এই বাতিঘরের পেছনে যার নিরলস শ্রম, দোয়া ও ত্যাগ মিশে আছে—তিনি মাওলানা নুরুল হুদা।

তিনি মাদ্রাসা গড়েছেন, কিন্তু শুধু দালান তৈরি করেননি; গড়েছেন মানুষ। এমন মানুষ, যাদের অন্তরে আছে তাকওয়া, চোখে আছে স্বপ্ন, আর চরিত্রে আছে মানবতার সৌন্দর্য।

শিশুদের প্রতি তার মমতা দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর সব কোমলতা বুঝি তার হৃদয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চারা তার কাছে গেলে ভয় পেত না; বরং ছুটে যেত আপন মানুষ ভেবে। তাদের মাথায় হাত রেখে তিনি যেভাবে দোয়া করতেন, তাতে মনে হতো—এ যেন কোনো শিক্ষক নন, একজন স্নেহময় পিতা তাঁর সন্তানকে আগলে রেখেছেন।

এতিম ছাত্রদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল আরও গভীর। পৃথিবীতে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার, তাদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিরাপদ ছায়া। কত ছাত্র হয়তো রাতের অন্ধকারে কান্না লুকিয়েছে, আর সেই কান্নার ভাষা বুঝেছেন এই মানুষটি। কেউ বই কিনতে পারেনি, কেউ খাবারের কষ্টে ছিল, কেউ হয়তো পরিবার হারিয়ে নিঃস্ব—কিন্তু মাদ্রাসার ভেতরে এসে তারা অনুভব করেছে, “আমরা একা নই।”  কারণ সেখানে একজন মানুষ ছিলেন, যিনি শুধু দায়িত্ব পালন করতেন না; হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন।

ইলমের জগতে তার গভীরতা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি শুধু একজন আলেম নন; তিনি একজন মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফাক্কির, মুহাক্কিক ও বিদগ্ধ গবেষক। তার জ্ঞানের পরিধি ছিল সমুদ্রের মতো বিস্তৃত, কিন্তু ব্যক্তিত্ব ছিল শিশিরবিন্দুর মতো বিনয়ী। বড় বড় কিতাবের জটিল আলোচনা তিনি এমনভাবে ব্যাখ্যা করতেন, যেন কঠিন জ্ঞানও হৃদয়ে নেমে আসে সহজ আলো হয়ে।  

তার দরসে বসলে মনে হতো—এ শুধু পাঠ নয়, আত্মার পরিশুদ্ধি। তার কথায় ছিল হিকমাহ, চোখে ছিল দরদ, আর প্রতিটি উপদেশে ছিল জীবনের গভীর সত্য।

আজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে তার হাজারো ছাত্র। কেউ শিক্ষক, কেউ খতিব, কেউ গবেষক, কেউ দ্বীনের খাদেম। কিন্তু তাদের সবার গল্পের শুরুতে একটি নাম অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে—মাওলানা নুরুল হুদা। তাদের হাতেখড়ি হয়েছিল তার হাত ধরেই। তার শেখানো আদব, আখলাক, ইলম ও আমলের শিক্ষা আজও তাদের জীবনকে পথ দেখায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এত কিছুর পরও তার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্রাও নেই। তিনি থাকেন নীরব। খুব নীরব। ঠিক গভীর নদীর মতো, যার শব্দ কম, কিন্তু গভীরতা অসীম।  

এখনো তিনি জীবিত আছেন এবং দ্বীনের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

এই যুগে মানুষ খ্যাতির জন্য ব্যস্ত, প্রশংসার জন্য অস্থির। অথচ এই মানুষটি জীবনভর কাজ করে গেছেন নিরবে। হয়তো এ কারণেই তাকে দেখলে মনে হয়—তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি যুগের প্রতিনিধি; এমন এক যুগ, যেখানে শিক্ষক মানে ছিল আত্মত্যাগ, আলেম মানে ছিল আমল, আর নেতৃত্ব মানে ছিল সেবক হয়ে থাকা।

আজ যখন সমাজে নৈতিকতার সংকট, মানবতার সংকট, আদর্শের সংকট—তখন মাওলানা নুরুল হুদার মতো মানুষদের দেখলেই আশার আলো জ্বলে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবী এখনো পুরোপুরি শূন্য হয়ে যায়নি; এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাদের হৃদয়ে মানবতার প্রদীপ জ্বলছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .