Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

কেন ঢেকে রাখা হয় কাবা শরিফ, কালো গিলাফের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১১:১৬ এএম

কেন ঢেকে রাখা হয় কাবা শরিফ, কালো গিলাফের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পৃথিবীতে এমন কোনো স্থাপনা নেই, যাকে ঘিরে এত গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যতটা হয়েছে মক্কার পবিত্র কাবাকে কেন্দ্র করে। 

প্রতিদিন প্রায় দুইশ কোটিরও বেশি মুসলমান নামাজে এই ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। হজ ও উমরাহর মৌসুমে লাখো মানুষ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করেন। কিন্তু কাবাকে ঘিরে মানুষের অন্যতম বড় কৌতূহল হলো এর কালো আবরণ বা গিলাফ। 

কেন কাবা ঘর কাপড়ে আবৃত থাকে, কখন থেকে এই প্রথা শুরু হয়েছে, কেন কালো রং বেছে নেওয়া হয়েছে এবং এই গিলাফের পেছনে কী ইতিহাস রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর ইসলামের ইতিহাস, আরব সভ্যতা ও মুসলিম সংস্কৃতির দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

কাবার আবরণকে আরবিতে বলা হয় ‘কিসওয়াহ’ (الكسوة)। এটি কেবল একটি কাপড় নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, শিল্প, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় আবেগের এক অনন্য প্রতীক। 

ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কিসওয়াহ মুসলিম সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ইসলামি ইতিহাসবিদদের অধিকাংশের মতে, কাবাকে কাপড়ে আবৃত করার প্রথা ইসলামের আবির্ভাবেরও বহু শতাব্দী পূর্বে প্রচলিত ছিল। 

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-আজরাকি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আখবারু মাক্কাহ-এ উল্লেখ করেছেন যে ইয়েমেনের হিমইয়ারি রাজারা কাবার জন্য বিশেষ আবরণ প্রদান করতেন। 

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আবু কারিব আসআদ কাবাকে সম্মান জানিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গিলাফ প্রদান করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মত রয়েছে, তবে অধিকাংশ গবেষক একমত যে কাবাকে আবৃত করার ঐতিহ্য ইসলামের আগের আরব সমাজেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

প্রাক-ইসলামি যুগে কাবার গিলাফ বিভিন্ন গোত্র ও শাসকের পক্ষ থেকে প্রদান করা হতো। তখনকার আরব সমাজে কাবার রক্ষণাবেক্ষণ এবং গিলাফ প্রদান ছিল মর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতীক। অনেক সময় বিভিন্ন গোত্র যৌথভাবে এই দায়িত্ব পালন করত। 

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, সে সময় চামড়া, ইয়েমেনি বস্ত্র এবং সূক্ষ্ম বোনা কাপড় দিয়েও কাবাকে আবৃত করা হতো।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বেও কাবা গিলাফে আবৃত ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই ঐতিহ্য বন্ধ হয়নি, বরং নতুন তাৎপর্য লাভ করে। মক্কা বিজয়ের পর কাবা পুনরায় তাওহিদের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে এর সম্মান ও পরিচর্যার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং তার পর খোলাফায়ে রাশেদিনও গিলাফ পরিবর্তনের ঐতিহ্য অব্যাহত রাখেন।

হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. এবং হযরত উসমান রা. এর যুগে ইয়েমেনি কাপড় দ্বারা কাবার গিলাফ তৈরি করা হতো। 

পরবর্তীতে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কাবার গিলাফ আরও উন্নত ও নান্দনিক রূপ লাভ করে। উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, মামলুক ও উসমানীয় শাসকরা কিসওয়াহকে মুসলিম বিশ্বের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বিশেষত আব্বাসীয় যুগে কাবার গিলাফে কালো রং জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার আগে সাদা, লাল, হলুদ, সবুজসহ বিভিন্ন রঙের গিলাফ ব্যবহারের ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। 

অনেক গবেষকের মতে, আব্বাসীয় খিলাফতের সরকারি পতাকার রং কালো হওয়ায় সেই সময় থেকে কালো গিলাফ স্থায়ী রূপ পেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এটি মুসলিম বিশ্বের কাছে কাবার পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।

মধ্যযুগে মিসর কাবার গিলাফ তৈরির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রায় সাতশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কায়রোতে বিশেষ কারখানায় কাবার গিলাফ প্রস্তুত করা হতো। প্রতি বছর ‘মাহমাল’ নামে পরিচিত এক বিশেষ শোভাযাত্রার মাধ্যমে কাবার নতুন গিলাফ মক্কায় পাঠানো হতো। 

এই শোভাযাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতো।

উসমানীয় খেলাফতের যুগে কিসওয়াহ তৈরির শিল্প আরও উন্নত হয়। দক্ষ কারিগররা সোনালি ও রুপালি সুতা দিয়ে কুরআনের আয়াত, তাওহিদের বাণী এবং অলংকরণ তৈরি করতেন। 

বর্তমানে যে সোনালি বেল্ট দেখা যায়, তাকে ‘হিযাম’ বলা হয়। এতে সুরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি এবং অন্যান্য কুরআনিক আয়াত সূচিকর্মের মাধ্যমে লেখা থাকে।

বর্তমানে সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর কিসওয়াহ-এ কাবার গিলাফ তৈরি করা হয়। ১৯২৭ সালে সৌদি রাষ্ট্র নিজস্বভাবে গিলাফ তৈরির উদ্যোগ নেয় এবং পরবর্তীতে আধুনিক কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। 

আজ শতাধিক দক্ষ কারিগর ও বিশেষজ্ঞ বছরের পর বছর ধরে একটি মাত্র গিলাফ তৈরিতে কাজ করেন।

বর্তমান গিলাফ তৈরিতে প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি সোনালি ও রুপালি সুতা দিয়ে সূচিকর্মে কুরআনের আয়াত লেখা হয়। 

বিভিন্ন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একটি কিসওয়াহ তৈরিতে কয়েক মিলিয়ন সৌদি রিয়াল ব্যয় হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ধর্মীয় আবরণগুলোর একটি।

প্রতি বছর ৯ জিলহজ, অর্থাৎ হজের আরাফার দিনে কাবার নতুন গিলাফ পরানো হতো। এখন এটি মহররম মাসে করা হয়। পুরোনো গিলাফ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। এর কিছু অংশ বিভিন্ন ইসলামি জাদুঘর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় অতিথিদের স্মারক হিসেবে প্রদান করা হয়।

তবে কাবার গিলাফ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কাবাকে কাপড়ে আবৃত করা ইসলামের ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কোনো বিধান নয়। কুরআন বা সহিহ হাদিসে কাবাকে আবৃত করার নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। 

এটি মূলত সম্মান, সংরক্ষণ, সৌন্দর্যায়ন এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ। ইসলামের দৃষ্টিতে কাবার মর্যাদা তার গিলাফের কারণে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশে এটি মুসলিম উম্মাহর কিবলা হওয়ার কারণে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা মক্কার ঘর, বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াতস্বরূপ। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৯৬)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা কাবাকে ‘আল-বাইতুল হারাম’ বা সম্মানিত ঘর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সম্মানই কাবার প্রকৃত মর্যাদার উৎস। গিলাফ সেই মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

বিশ্বায়নের এই যুগেও কাবার কালো আবরণ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক দৃশ্যমান প্রতীক। যুগ পরিবর্তিত হয়েছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, রাজবংশ বিলীন হয়েছে, কিন্তু কাবার গিলাফের ঐতিহ্য টিকে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। 

এটি কেবল একটি কাপড় নয়, বরং মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস, শিল্প, নান্দনিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং কাবার প্রতি কোটি কোটি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার জীবন্ত দলিল।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .