Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

মহররম কেন হিজরি বছরের প্রথম মাস?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

মহররম কেন হিজরি বছরের প্রথম মাস?

কেন মুহাররম হিজরি বছরের প্রথম মাস? ছবি: সংগৃহীত

মানবজাতির ইতিহাসে প্রতিটি জাতি তাদের ক্যালেন্ডারকে কোনো না কোনো স্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। কোথাও রাজাদের বিজয়গাঁথা, কোথাও জাতীয় গৌরবের স্মৃতি, আবার কোথাও কোনো মহান ব্যক্তির জন্মকে কেন্দ্র করে বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়েছে। কিন্তু ইসলামি বর্ষপঞ্জির ভিত্তি কোনো জন্মোৎসব, রাজ্যাভিষেক কিংবা সামরিক বিজয় নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইমান, ত্যাগ, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার এক অনন্য ইতিহাস— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। সেই কারণেই হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম মুসলিম উম্মাহর কাছে কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কেন চালু হলো হিজরি সন?

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে একটি নির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। হিজরি ১৭ সালে ইয়েমেনের গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) অভিযোগ করেন যে, খলিফার পক্ষ থেকে প্রেরিত চিঠিপত্রে কোনো তারিখ উল্লেখ না থাকায় আগে-পরে পাঠানো নির্দেশনা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ প্রেক্ষাপটে হজরত ওমর (রা.) সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, মুসলিম জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাকে ভিত্তি করে বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হবে। অবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকে ইসলামি সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কারণ এই হিজরতই ইসলামের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল এবং মুসলিম সমাজকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দিয়েছিল।

মুহাররম কেন হিজরি বছরের প্রথম মাস?

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— হিজরতের ঘটনা তো রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল, তাহলে বছর শুরু হলো মহররম দিয়ে কেন?

ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল জিলহজ মাসে। এর পরবর্তী নতুন চাঁদ ছিল মহররমের চাঁদ। তাই সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শক্রমে মুহাররমকেই হিজরি বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করেন। এতে হিজরতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

মহররম: আল্লাহর সম্মানিত মাস

মহররম ইসলামের চারটি সম্মানিত বা হারাম মাসের অন্যতম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

 إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ 

‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত (পবিত্র)।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৩৬)

এই চারটি পবিত্র মাস হলো— জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষায় মহররম

রাসুলুল্লাহ (সা.) মহররমকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে—

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ

‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (মুসলিম ১১৬৩)

এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মহররমের ফজিলত ইসলামের শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আশুরার রোজা ও নববী নির্দেশনা

মহররম মাসের দশম দিন ‘আশুরা’ বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ

‘আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই নবম মহররমও রোজা রাখব।’ (মুসলিম ১১৩৪)

এর মাধ্যমে তিনি ইহুদিদের অনুসরণ থেকে ভিন্নতা বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছেন।

কারবালা ও মহররম: সঠিক উপলব্ধি

মহররম মাসের মর্যাদা কারবালার ঘটনার কারণে নয়; বরং এটি আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) কর্তৃক পূর্ব থেকেই সম্মানিত মাস হিসেবে নির্ধারিত। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হিজরি ৬১ সালে, অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে।

সাইয়িদুনা হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে মুসলিম ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। তবে মহররমের ইবাদত, রোজা ও ফজিলতকে কেবল কারবালার ঘটনার সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মহররম মাসে আমাদের করণীয়

  • আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা।
  • বিশেষত ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা পালন করা।
  • তাওবা, ইস্তিগফার ও নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
  • কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
  • আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুন হিজরি বছরের সূচনা করা।
  • হিজরি ক্যালেন্ডারের ব্যবহার পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে বাড়ানোর চেষ্টা করা।

বর্জনীয় বিষয়

  • শরিয়তসম্মত নয় এমন শোকানুষ্ঠান, মিছিল বা উদ্ভাবিত আচার-অনুষ্ঠান।
  • লোকদেখানো ইবাদত ও কুসংস্কার।
  • দিনটিকে উৎসব বা বিশেষ আনন্দ-উদযাপনের উপলক্ষ বানানো।
  • কুরআন-সুন্নাহবহির্ভূত যে কোনো আমল।

মহররম কেবল একটি নতুন মাসের নাম নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে ইমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার এক জীবন্ত প্রতীক। হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা হিজরতের মতো মহান ঘটনার মাধ্যমে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথে সংগ্রাম, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ এবং দ্বীনের জন্য আত্মনিবেদনই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। তাই নতুন হিজরি বছরের সূচনায় আমাদের অঙ্গীকার হোক— জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করা, তাকওয়ার পথে অটল থাকা এবং মহররমের পবিত্রতাকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম