পবিত্র কাবা শরীফ।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মক্কা নগরী পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরীগুলোর একটি। ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই নগরীকে বলা হয় উম্মুল কুরা বা জনপদসমূহের মা।
পবিত্র কুরআনে এই সম্মানিত নগরীকে নিরাপদ নগরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: শপথ এই নিরাপদ নগরের। (সুরা আত-ত্বীন: আয়াত, ৩)
এই শহরেই অবস্থিত আল্লাহর ঘর কাবা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ দিলাম, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। (সুরা বাকারা: আয়াত, ১২৫)
কাবা ঘরই পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর: নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর স্থাপিত হয়েছে, তা তো মক্কায় অবস্থিত, যা বরকতময় এবং সমগ্র জগতের মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। (সুরা আলে ইমরান: আয়াত, ৯৬)
আমরা দৈনিক পাঁচবার এই কাবার দিকেই মুখ করে নামাজ আদায় করি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। কাবার দিকে মুখ না করে নামাজ শুদ্ধ হয় না।
কাবা নির্মাণের ধারাবাহিক ইতিহাস
প্রথম নির্মাতা ফেরেশতারা: ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, জিনদের পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করার পর আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা সপ্তম আকাশের বাইতুল মামুরের বরাবর সর্বপ্রথম কাবা ঘর নির্মাণ করেন।
দ্বিতীয় নির্মাতা আদম (আ.) ও তার তৃতীয় পুত্র শীষ (আ.)। নুহ আ.-এর মহাপ্লাবনে আদম (আ.)-এর নির্মিত কাবা ভবন বিলীন হয়ে যায়।
তৃতীয় নির্মাতা ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) ইবরাহিম (আ.)-এর সময়ে কাবার কোনো নিদর্শন অবশিষ্ট ছিল না। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাকে প্রাচীন ভিত দেখিয়ে দেন এবং নতুন করে কাবা নির্মাণের নির্দেশ দেন। ইবরাহিম ও তার পুত্র ইসমাইল আ. মিলে এই পবিত্র ঘর নির্মাণ করেন: আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উঁচু করছিলেন এবং বলছিলেন, হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা বাকারা: আয়াত, ১২৭)
নির্মাণ শেষে ইবরাহিম (আ.) মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা লাব্বাইক বলেছিল, দুনিয়াতে তাদের হজ নসিব হয়েছে এবং হবে। (ইবনে কাসির)
পরবর্তীকালের সংস্কার ও নির্মাণ: ইবরাহিম (আ.)-এর পরও বহুবার কাবা ঘরের নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে। আমালেকা সম্প্রদায় একবার কাবা ঘর ধসে পড়লে তারা পুনর্নির্মাণ করে।
পরবর্তীতে ধ্বসে গেলে বনু জুরহুম গোত্র কাবা নির্মাণের সৌভাগ্য লাভ করে।
কুরাইশ বংশ: রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের পূর্বে কুরাইশরা কাবা সংস্কার করে। তারা কাজটি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। বনু আবদে মানাফ ও বনু জুহরা দরজার দায়িত্ব নেয়। বনু মাখজুম ও অন্যান্য গোত্র রুকনু আসওয়াদ ও রুকনু ইয়ামানির মধ্যবর্তী অংশের দায়িত্ব নেয়। বনু জুমাহ ও সাহমা ছাদ নির্মাণ করে।
বনু আবদুদ-দার, বনু আসাদ ও বনু আদি হাতিমের অংশ সংস্কার করে। হাতিম বা হিজর মূলত কাবার অংশ ছিল, কিন্তু বৈধ অর্থের অভাবে কুরাইশরা তা অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এ সময় কুরাইশরা একটি বড় পরিবর্তন আনে।
আগে কাবার দুটি দরজা ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাশে। তারা পশ্চিম পাশের দরজাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। (সিরাত ইবনে হিশাম)
হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ও রাসুল (সা.)-এর ফয়সালা
নির্মাণ শেষে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। কয়েক দিন পর তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আগামীকাল যে ব্যক্তি প্রথম কাবায় প্রবেশ করবে, সে-ই ফয়সালা দেবে। পরদিন রাসুল (সা.) সর্বপ্রথম প্রবেশ করেন। তাকে দেখে সবাই বলে উঠল, ইনি তো আল-আমিন, আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।
রাসুল সা. একটি চাদর আনতে বলেন। নিজ হাতে পাথরটি চাদরে রেখে প্রত্যেক গোত্রের নেতাকে চাদরের একপাশ ধরতে বলেন। এরপর সবাই মিলে পাথরটি নির্দিষ্ট স্থানে নিলে তিনি নিজ হাতে তা স্থাপন করেন।
কুরাইশরা ইবরাহিমি ভিত্তিতে পরিবর্তন আনায় রাসুল (সা.) আয়েশাকে (রা.) বলেছিলেন: হে আয়েশা! তোমার কওম যদি নতুন মুসলিম না হতো, তবে আমি কাবা ঘর ভেঙে ভূমির সমতলে স্থাপন করতাম। এর দুটি দরজা করতাম, একটি পূর্বে অপরটি পশ্চিমে। আর হাতিমের ছয় গজ কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম। কেননা কুরাইশরা নির্মাণের সময় এর ভিত্তি ছোট করে দিয়েছে। (সহিহ মুসলিম)
পরবর্তী নির্মাণ: আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ৬৪ হিজরিতে রাসুল সা.-এর ইচ্ছা অনুযায়ী ইবরাহিমি ভিত্তির উপর কাবা পুনর্নির্মাণ করেন এবং হাতিমকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ: ৭৪ হিজরিতে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে শহিদ করে তার নির্মিত ভবন ভেঙে কুরাইশি ভিত্তির উপর আবার কাবা নির্মাণ করেন।
পরবর্তীতে এক ন্যায়পরায়ণ শাসক আবার ইবরাহিমি ভিত্তিতে কাবা নির্মাণ করতে চাইলে ইমাম মালিক রহ. নিষেধ করেন। তিনি বলেন, বারবার নির্মাণ হলে প্রত্যেক শাসক নিজের কীর্তি রাখতে চাইবে। এতে এই পবিত্র গৃহের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
বর্তমানে কাবা হাজ্জাজের নির্মাণের উপরই প্রতিষ্ঠিত। তবে প্রতিবছর কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।
লেখক: ফাজেলে জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম

