Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

জানাজায় বেশি মানুষ হলেই কি ক্ষমা নিশ্চিত?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

জানাজায় বেশি মানুষ হলেই কি ক্ষমা নিশ্চিত?

জানাজা। ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যু দুনিয়ার জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর একজন মুসলমানের জন্য জীবিতদের সবচেয়ে বড় উপহার হলো তার জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা। ইসলামে জানাজার নামাজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মৃত মুসলমানের জন্য সমষ্টিগতভাবে আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত ও রহমত প্রার্থনার এক মহিমান্বিত ইবাদত। হাদিসে জানাজার জামাতে অধিকসংখ্যক মুমিনের অংশগ্রহণ, তাদের ইখলাসপূর্ণ দোয়া এবং মৃত ব্যক্তির প্রতি উত্তম সাক্ষ্যের বিশেষ ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো— সংখ্যার অহংকার নয়; বরং আন্তরিকতা, ইমান ও ইখলাসই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মূল্যবান।

জানাজায় একশ মুমিনের দোয়া—রহমতের সুসংবাদ

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا مِنْ مَيِّتٍ تُصَلِّي عَلَيْهِ أُمَّةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَبْلُغُونَ مِائَةً، كُلُّهُمْ يَشْفَعُونَ لَهُ، إِلَّا شُفِّعُوا فِيهِ

‘যে মৃত ব্যক্তির জানাজায় একশজন মুসলমান অংশগ্রহণ করে এবং সবাই তার জন্য সুপারিশ (ক্ষমা প্রার্থনা) করে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করেন।’ (মুসলিম ৯৪৭, ২০৮৭)

এ হাদিস প্রমাণ করে, অধিকসংখ্যক মুমিনের আন্তরিক দোয়া মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমত লাভের একটি বড় মাধ্যম।

৪০ জন মুসলমানের দোয়াও কবুল হয়

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَا مِنْ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيَقُومُ عَلَى جَنَازَتِهِ أَرْبَعُونَ رَجُلًا، لَا يُشْرِكُونَ بِاللَّهِ شَيْئًا، إِلَّا شَفَّعَهُمُ اللَّهُ فِيهِ

‘কোনো মুসলমান মারা গেলে তার জানাজায় যদি এমন চল্লিশজন লোক উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, তবে আল্লাহ তাদের সুপারিশ তার ব্যাপারে কবুল করেন।’ মুসলিম ৯৪৮, ২০৮৮)

এখানে বিশেষভাবে বিশুদ্ধ আকিদা ও আন্তরিক ইমানের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

একশ নাকি চল্লিশ—দুই হাদিসের মধ্যে কি বিরোধ আছে?

মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, দুটি হাদিসের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং এটি আল্লাহ তাআলার অসীম রহমতেরই প্রকাশ। প্রথমে একশজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে উম্মতের প্রতি সহজীকরণ হিসেবে চল্লিশজন ইমানদার মুসলমানের দোয়াকেও কবুল হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, মূল বিষয় সংখ্যা নয়; বরং ইমান, ইখলাস ও আন্তরিক দোয়া।

বেশি মানুষ মানেই কি ক্ষমা নিশ্চিত?

না। এই হাদিসগুলো সুসংবাদ ও আশার বাণী বহন করে; এগুলো কোনো ব্যক্তির জান্নাত বা জাহান্নাম সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

‘নিশ্চয়ই আপনার রবই সবচেয়ে ভালো জানেন কে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সঠিক পথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আন-নাজম: আয়াত ৩০)

চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।

মৃত ব্যক্তির সম্পর্কে মানুষের উত্তম সাক্ষ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন— রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দিয়ে একটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলে সাহাবিগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করেন। তখন তিনি বলেন—

‘وَجَبَتْ’ (অবধারিত হয়েছে)।

পরে আরেকটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলে লোকেরা তার সমালোচনা করলে তিনি আবার বলেন—

‘وَجَبَتْ’ (অবধারিত হয়েছে)।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন—

‘তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।’ (বুখারি ১৩৬৭, মুসলিম)

অর্থাৎ কোনো মুমিনের প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালো সাক্ষ্য তার উত্তম পরিণতির আশাব্যঞ্জক লক্ষণ হতে পারে।

লোক কম হলেও তিন কাতার করার সুন্নাহ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيُصَلِّي عَلَيْهِ ثَلَاثَةُ صُفُوفٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ إِلَّا أَوْجَبَ

‘যে মুসলমানের জানাজায় মুসলমানদের তিনটি কাতার হয়, তার জন্য (আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের সুসংবাদ) অবধারিত হয়।’ (আবু দাউদ ৩১৬৬, তিরমিজি ১০২৮)

জানাজার মূল উদ্দেশ্য— লোকদেখানো নয়, আন্তরিক দোয়া

জানাজায় মানুষের উপস্থিতি মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

‘তাদেরকে শুধু এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে।’ (সুরা আল-বাইয়্যিনাহ: আয়াত ৫)

ইখলাস তথা একনিষ্ঠতাই জানাজার প্রাণ।

জানাজায় অংশগ্রহণকারীর জন্য পাহাড়সম সওয়াব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ، وَمَنْ شَهِدَهَا حَتَّى تُدْفَنَ فَلَهُ قِيرَاطَانِ

‘যে ব্যক্তি জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করে, সে এক কিরাত সওয়াব পায়। আর যে দাফন পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব লাভ করে।’

সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন— দুই কিরাত কী?

তিনি (রাসুলুল্লাহ সা.) বললেন—

مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ

‘দুটি বিশাল পাহাড়সম সওয়াব।’ (বুখারি ১৩২৫, মুসলিম ৯৪৫)

জানাজা—এক মুমিনের প্রতি আরেক মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ হক

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ... وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ

‘এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে... তার একটি হলো জানাজার সঙ্গে থাকা।’ বুখারি ১২৪০, মুসলিম ২১৬২)

জানাজার নামাজ মৃত মুসলমানের জন্য রহমত ও মাগফিরাত কামনার এক মহান ইবাদত। জানাজায় অধিকসংখ্যক মুমিনের উপস্থিতি, তাদের আন্তরিক দোয়া এবং মৃত ব্যক্তির প্রতি উত্তম সাক্ষ্য— সবই আল্লাহর রহমত লাভের আশাব্যঞ্জক কারণ। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, সংখ্যার গৌরব নয়; বরং বিশুদ্ধ আকিদা, ইখলাস ও আন্তরিক দোয়াই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।

তাই কোনো মুসলমানের মৃত্যুসংবাদ পেলে সামর্থ্য অনুযায়ী তার জানাজায় শরিক হওয়া, তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা এবং তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। একই সঙ্গে আমাদেরও এমন জীবন গড়ে তোলা উচিত, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ আমাদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করে এবং উত্তম সাক্ষ্য প্রদান করে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম