Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

দেরিতে সন্তান নেওয়ার ভাবনা, কুরআন-হাদিস যা বলছে

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ পিএম

দেরিতে সন্তান নেওয়ার ভাবনা, কুরআন-হাদিস যা বলছে

ফাইল ছবি

বিয়ের পরপরই সন্তান নেবেন, নাকি কিছুটা সময় অপেক্ষা করবেন—এ প্রশ্নে অনেক নবদম্পতি দ্বিধায় থাকেন। আর্থিক স্থিতিশীলতা, ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা, মানসিক প্রস্তুতি কিংবা সংসার গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কারণে অনেকে সন্তান গ্রহণ পিছিয়ে দেন। এ জন্য কেউ কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিরও আশ্রয় নেন। তবে এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী—তা নিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, সন্তান আল্লাহর দেওয়া অন্যতম বড় নিয়ামত। জীবনের কোন সময়ে সন্তান আগমন একজন মানুষের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন, শিক্ষা বা কল্যাণ বয়ে আনবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। অনেকেই মনে করেন, তারা এখনো সন্তান নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নন। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত জ্ঞান কেবল মহান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তাই কেবল অনুমাননির্ভর আশঙ্কার ভিত্তিতে সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেওয়া যথার্থ নয়।

সন্তান মানুষকে যে শিক্ষা দেয়

বর্তমান সময়ে অনেক দম্পতি প্রথমে ক্যারিয়ার গড়া, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা স্থায়ী জীবনযাপন প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেন। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলে এ ধরনের পরিকল্পনা আরও বেশি দেখা যায়।

তবে ইসলামী দৃষ্টিতে, শুধু পার্থিব সফলতার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে সন্তান লালন-পালনের মাধ্যমে মানুষ ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ, সময় দেওয়া এবং পারস্পরিক সম্মানের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণাবলি অর্জন করে। এসব মূল্যবোধ অর্থ দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্যগত গুরুতর ঝুঁকি না থাকলে সন্তান গ্রহণে অযথা ভয় না পাওয়ার শিক্ষা ইসলাম দেয়।

কুরআনে সন্তানকে বলা হয়েছে ‘চোখের শীতলতা’

পবিত্র কোরআনে সন্তানকে চোখের শীতলতা ও প্রশান্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে—

وَ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَ ذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّ اجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৪)

অভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

অনেকে অভাব-অনটন ও বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে সন্তান নিতে চান না বা সন্তান নষ্ট করেন। পবিত্র কুরআনে বিষয়টিকে মহাপাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং সন্তানের রিজিকের ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সন্তান এবং সন্তানের অভিভাবক সবার রিজিক দান করেন। বর্ণিত হয়েছে—

 وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَكُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُهُمۡ وَ اِیَّاكُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَهُمۡ كَانَ خِطۡاً كَبِیۡر

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিজিক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৩১)

তাফসিরবিদরা উল্লেখ করেছেন, এ আয়াত মূলত জাহেলিয়াত যুগের সেই নির্মম প্রথা বাতিল করার জন্য নাজিল হয়েছিল, যখন দারিদ্র্যের আশঙ্কায় বিশেষ করে কন্যাশিশুদের হত্যা করা হতো।

এ বিষয়ে সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? জবাবে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তোমার সঙ্গে আহার করবে—এই আশঙ্কায় নিজের সন্তানকে হত্যা করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৭৭)

দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান গ্রহণ দীর্ঘদিন পিছিয়ে দিতে অনেকেই নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করেন। দীর্ঘমেয়াদে এসব ওষুধ ব্যবহারে শরীরে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। রক্ত সঞ্চালনজনিত সমস্যা, স্তন, জরায়ু ও লিভারের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় সন্তান গ্রহণ পিছিয়ে দিতে গিয়ে অনেকের ক্ষেত্রে বয়সজনিত কারণে সন্তান ধারণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার দীর্ঘদিন সন্তানবিহীন জীবনযাপনের অভ্যাসের কারণে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, ধৈর্য ও নিঃশর্ত ভালোবাসা দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও আগের মতো নাও থাকতে পারে।

ইসলামের শিক্ষা

ইসলামী দৃষ্টিতে সন্তান কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত। তাই সন্তান গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু আর্থিক হিসাব-নিকাশ নয়, বরং আল্লাহর ওপর ভরসা, বাস্তব পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ—সবকিছু বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যগত জটিলতা বা চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .