বরযখের নীরব জগৎ, মৃত্যুর ওপারে দৃষ্টি ও শ্রবণের প্রকৃত রহস্য
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত্যুর পরপারে চলে যাওয়া মানুষ জীবিতদের দেখতে পান কি না, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত সালাম সেই নীরব বাসিন্দার কাছে পৌঁছায় কি না এই প্রশ্ন মানবহৃদয়ে যুগে যুগে ঘুরপাক খেয়েছে।
ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারে এই বিষয়ে রয়েছে সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক আলোচনা, যেখানে সুনির্দিষ্ট দলিলের পাশাপাশি রয়েছে বিনয়ী অনিশ্চয়তাও, কারণ বরযখের জগৎ মূলত গায়েবের অন্তর্ভুক্ত এক রহস্যময় বাস্তবতা।
মৃত্যুর পরের অবস্থান নিয়ে কুরআনের কেন্দ্রীয় পরিভাষা হলো বরযখ, অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী এক অন্তর্বর্তী জগৎ। সূরা মুমিনূনে আল্লাহ তাআলা জানান, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান পর্যন্ত মানুষের সামনে থাকে একটি অন্তরাল, একটি বরযখ, যা অতিক্রম করার সুযোগ আর তার থাকে না।
এ থেকে বোঝা যায়, মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা দুনিয়ার জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। তবে শহীদদের ব্যাপারে কুরআন একটি স্বতন্ত্র ও স্পষ্ট অবস্থান দেয়। সূরা আলে ইমরানে ঘোষিত হয়েছে, আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত মনে না করার নির্দেশ, কারণ তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, রিজিকপ্রাপ্ত।
এই আয়াতের ভিত্তিতে বহু মুফাসসির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে বরযখের জীবন একেবারে নিষ্ক্রিয় বা অচেতন কোনো অবস্থা নয়, বরং সেখানে বিদ্যমান এক স্বতন্ত্র ধরনের সচেতনতা, যার প্রকৃতি দুনিয়ার জীবনের সাথে তুলনীয় নয়।
এই আলোচনার কেন্দ্রীয় হাদিসটি এসেছে বদর যুদ্ধ-পরবর্তী এক ঘটনা থেকে। যুদ্ধের পর নিহত কুরাইশ নেতাদের একটি কূপে ফেলে দেওয়া হলে রাসুলুল্লাহ সা. সেই কূপের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নাম ধরে সম্বোধন করেন এবং বলেন, তোমাদের রব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তোমরা সত্য বলে পেয়েছ।
সাহাবিরা বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি জবাব দেন, তোমরা যা শুনছ, তারাও তার চেয়ে বেশি কিছু শুনছে না, তবে তারা উত্তর দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিসের ব্যাখ্যা নিয়ে সাহাবিদের মধ্যেই মতভেদ দেখা দেয়। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দিতেন রাসুলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, এখন তারা জেনে গেছে আমি যা বলেছিলাম তা সত্য ছিল, অর্থাৎ এটি মৃতদের শোনার সামর্থ্যের ঘোষণা নয়, বরং একটি রূপক উক্তি।
এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তিনি কুরআনের সেই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করতেন, যেখানে বলা হয়েছে, তুমি মৃতকে শোনাতে পারবে না। এই একটি হাদিসের আক্ষরিক ও রূপক ব্যাখ্যার এই পার্থক্যই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই বিষয়ের সমগ্র আলোচনার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
মৃতের শ্রবণ ও দর্শনক্ষমতা মূলত আকিদা ও হাদিসশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয়, যা চার মাযহাবের মৌলিক ফিকহি পার্থক্যের অংশ নয়, বরং প্রতিটি মাযহাবের ঐতিহ্যের অভ্যন্তরেই এ নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
হানাফি ঐতিহ্যে ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. ও আল্লামা আলুসি রহ.-এর মতো আলিমরা মৃতের সীমিত সচেতনতার পক্ষে মত দিয়েছেন, বিশেষত কবর জিয়ারতের সময় সালামের জবাব প্রাপ্তির হাদিসগুলোর আলোকে।
তারা মনে করেন, এই ধরনের বর্ণনা অস্বীকার করার মতো কোনো শক্তিশালী বিপরীত দলিল নেই।
মালিকি ঐতিহ্যে ইমাম কুরতুবি রহ. তার তাফসিরে ও পৃথক রচনায় মৃতের শ্রবণক্ষমতা সম্পর্কিত হাদিসগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করেছেন এবং কবর জিয়ারতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে এর সাথে সংযুক্ত করেছেন।
শাফিঈ ঐতিহ্যে ইমাম নববি রহ. এই বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি কবর জিয়ারত ও সালামের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলোকে আমলযোগ্য মনে করলেও মৃতের প্রকৃত অনুভূতির ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো থেকে বিরত থেকেছেন, একে আল্লাহর জ্ঞানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
হাম্বলি ঐতিহ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ও তার ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম রহ. সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও বিস্তৃত অবস্থান নিয়েছেন।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তার ‘কিতাবুর রুহ’ গ্রন্থে বহু হাদিস ও যুক্তি সাজিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে মৃতরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জীবিতদের সালাম শুনতে পারে এবং পরিচিত কবর জিয়ারতকারীকে চিনতেও পারে। তাঁদের মূল যুক্তি হলো, কবরস্থানে সালাম দেওয়ার নির্দেশ ও সালামের জবাব প্রাপ্তির হাদিসগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি মৃতরা তা শুনতেই না পায়।
এই ঐতিহ্যগুলোর বিপরীতে, প্রতিটি মাযহাবেরই কিছু আলিম আয়েশা রা.-এর ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেছেন, মৃতের শ্রবণ বা দর্শনক্ষমতা দুনিয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতার অনুরূপ কিছু নয়, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন এক ব্যতিক্রমী অবস্থা, যা সাধারণ নিয়মে পরিণত করা সমীচীন নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনায় এসেছে, পরিচিত কারও কবরের পাশ দিয়ে সালাম দিয়ে গেলে আল্লাহ তাআলা মৃত ব্যক্তির রুহ ফিরিয়ে দেন, যাতে সে সালামের জবাব দিতে পারে। এই হাদিসের ভিত্তিতে অনেক আলিম মত দেন, এটি প্রমাণ করে মৃতের এক ধরনের সীমিত ও বিশেষ সচেতনতা বরযখেও অব্যাহত থাকে, যদিও তা জীবিত মানুষের সাধারণ দৃষ্টিশক্তি বা চেতনার সাথে সম্পূর্ণ তুলনীয় নয়।
এই বর্ণনাটিকে চার মাযহাবের অধিকাংশ পরবর্তী আলিমই মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন, যদিও এর তাৎপর্য নিয়ে তাঁদের ব্যাখ্যায় কিছুটা তারতম্য থেকে গেছে কেউ একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন, কেউবা একে বিশেষ, সীমিত ও অলৌকিক এক ব্যতিক্রম হিসেবে দেখেছেন, যা সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ নয়।
চার মাযহাবের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নে ইসলামি জ্ঞানকাণ্ডে মূলত দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি ধারা মনে করে, মৃতরা নির্দিষ্ট ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে জীবিতদের কণ্ঠস্বর শুনতে ও চিনতে পারে, বিশেষত পরিচিতজন কবর জিয়ারতে এলে এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন মূলত হাম্বলি ঐতিহ্যের ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম, পাশাপাশি হানাফি ও মালিকি ঐতিহ্যের একাংশ আলিমও।
অন্য ধারা সতর্কতার সাথে বলে, এই বিষয়টি মূলত গায়েবের অন্তর্ভুক্ত, আর নির্দিষ্ট বর্ণনাগুলোকে সাধারণ নিয়মে পরিণত না করে ব্যতিক্রমী ও আল্লাহর জ্ঞানের ওপর ন্যস্ত রাখাই শ্রেয়—এই সতর্ক ও সংযত অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন মূলত শাফিঈ ঐতিহ্যের ইমাম নববি ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর ব্যাখ্যাকে অনুসরণকারী আলিমগণ।
তবে চার মাযহাবের প্রায় সব আলিমই একটি বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত কবর জিয়ারত, মৃতের জন্য দোয়া ও সালাম প্রদান একটি শরিয়তসম্মত ও প্রতিদানযোগ্য আমল, যার আধ্যাত্মিক প্রভাব যেভাবেই কার্যকর হোক না কেন, তা জীবিতকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মৃতের জন্য রহমতের দোয়া বয়ে আনে।
বরযখের এই জগৎ শেষ পর্যন্ত মানুষের পূর্ণ জ্ঞানের বাইরে থেকে যায়, আর ইসলামি চিন্তাধারার সৌন্দর্য এখানেই নিহিত, যেখানে অজানা বিষয়ে চূড়ান্ত দাবি না করে প্রাপ্ত দলিলের আলোকে বিনয়ী অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়াই প্রকৃত জ্ঞানের পরিচয় বলে বিবেচিত হয়।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর


