ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সত্যবাদিতা মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চারিত্রিক ভূষণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সত্যের পথে চলার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কোনো তথ্য সত্য হলেই তা যত্রতত্র বা যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রকাশ করা শরিয়তসম্মত হয় না। কথাটি বলার পেছনের উদ্দেশ্য, প্রাসঙ্গিকতা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে সত্য কথাও অনেক সময় মারাত্মক পাপে রূপ নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাকসংযমের মূলনীতি ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি ৬৪৭৫)
যেসব ক্ষেত্রে সত্য বলাও গুনাহের কারণ
১. গিবত বা পরনিন্দা করা
কারও অনুপস্থিতিতে তার বাস্তব কোনো দোষ বা ত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশ করা গিবতের অন্তর্ভুক্ত। কথাটি সত্য হলেও তা প্রকাশ করা সম্পূর্ণ হারাম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ، فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ
‘তোমরা কি জানো গিবত কী?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, ‘তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয়ের আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থাকে?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে; আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (মুসলিম ২৫৮৯)
২. মানুষের মাঝে বিবাদ বা ফিতনা সৃষ্টি করা (চোগলখোরি)
একজনের সত্য কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরানো বা শত্রুতা সৃষ্টি করাকে ‘নামিমাহ’ বলা হয়। হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন—
لاَ يَدْخُلُ الجَنَّةَ قَتَّاتٌ
‘চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (বুখারি ৬০৫৬)
৩. আমানত বা গোপনীয়তা ফাঁস করা
কেউ বিশ্বাস করে কোনো ব্যক্তিগত কথা জানালে বা গোপন রাখতে বললে তা রক্ষা করা আমানত। অনুমতি ছাড়া তা প্রকাশ করা খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ الحَدِيثَ ثُمَّ التَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ
‘কোনো ব্যক্তি যখন কোনো কথা বলার পর এদিক-ওদিক তাকায় (কেউ শুনছে কি না দেখে), তখন তা আমানত হিসেবে গণ্য হয়।’ (আবু দাউদ ৪৮৬৮)
৪. অকারণে অন্যের সম্মানহানি করা
কোনো ব্যক্তির অতীতের ভুলত্রুটি অপ্রয়োজনে জনসমক্ষে প্রকাশ করে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ، دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ
‘এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অপর মুসলিমের জন্য সম্পূর্ণ হারাম।’ (মুসলিম ২৫৬৪)
৫. অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি বা ফিতনা ছড়ানো
‘যে সত্য কথা বলার শরিয়তসম্মত কোনো প্রয়োজন নেই, অথচ তা বললে সমাজে বিশৃঙ্খলা, শত্রুতা বা কারও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সেখানে নীরব থাকাই আবশ্যক। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
‘কাউকে ক্ষতিসাধন করা যাবে না এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না (বা ক্ষতির বিনিময়ে ক্ষতি করা যাবে না)।’ (ইবনে মাজাহ ২৩৪০)
কখন সত্য প্রকাশ করা জরুরি?
সব ক্ষেত্রে নীরব থাকা সমীচীন নয়। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সত্য তথ্য প্রকাশ করা শরিয়তসম্মত ও আবশ্যক। তাহলো—
- মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচারকের কাছে অভিযোগ পেশ করা।
- বৈবাহিক সম্পর্কের প্রস্তাব এলে পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানো।
- আদালতে নিরপেক্ষ সাক্ষ্য প্রদান করা।
- ব্যবসায়িক লেনদেনে ধোঁকাবাজি থেকে অন্যকে সতর্ক করা।
- সাধারণ মানুষের দ্বীনি বা পার্থিব বড় ক্ষতি থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সচেতন করা।
কথা বলার আগে তিনটি আত্মজিজ্ঞাসা
যেকোনো সত্য কথা বলার আগে একজন মুমিনের নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা উচিত—
১. কথাটি কি শতভাগ সত্য?
২. এই মুহূর্তে এটি বলা কি সত্যিই প্রয়োজনীয়?
৩. কথাটি প্রকাশের ফলে কারও অহেতুক ক্ষতি বা সম্মানহানি হবে কি না?
সত্যের উদ্দেশ্য হতে হবে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা, কোনোভাবেই ফিতনা বা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করা নয়। সত্য কোথায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে হবে এবং কোথায় প্রজ্ঞার সঙ্গে নীরব থাকতে হবে—এই ভারসাম্য বজায় রাখাই একজন প্রকৃত মুমিনের তাকওয়া ও প্রজ্ঞার পরিচয়।

