ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবন সবসময় একই নিয়মে চলে না। কখনো প্রাচুর্যের জোয়ার আসে, কখনোবা অভাব-অনটনের টানাপোড়েন ঘিরে ধরে। ঋণের বোঝা, সংসারের অপূর্ণ চাহিদা কিংবা আর্থিক টানাপোড়েন মানুষের মানসিক শক্তিকে নাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় নিজের সামর্থ্য নিয়ে মনে জন্ম নেয় গভীর হতাশা, অন্যের বাহ্যিক প্রাচুর্য দেখে নিজের জীবনকে মনে হতে থাকে ব্যর্থ। তবে একজন মুমিনের চোখে অভাব কেবলই এক পার্থিব কষ্ট নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক গভীর পরীক্ষা এবং তাঁর আরও কাছাকাছি যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
১. অভাবকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করা
অভাব-অনটন এলেই নিরাশ হয়ে ভাবা যাবে না যে আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মুমিনের জীবনে সুখ ও দুঃখ—উভয়ই পরীক্ষার মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
‘মুমিনের বিষয়টি কতই না আশ্চর্যজনক! তার সব কাজই কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। সে সুখে থাকলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখ-কষ্টে পড়লে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
২. সংকটেও হালাল উপার্জনে অবিচল থাকা
টানাপোড়েনের সময় শয়তান দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য সুদ, ঘুষ, জুয়া বা প্রতারণার পথকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে দেখায়। কিন্তু অভাব কখনো হারামকে হালাল করার অজুহাত হতে পারে না। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা—
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ২-৩)
৩. রিজিকের মালিক আল্লাহ— এই বিশ্বাসে অটল থাকা
চাকরি, ব্যবসা কিংবা কোনো ব্যক্তি রিজিকের মূল উৎস নয়; এগুলো কেবল বাহ্যিক মাধ্যম মাত্র। প্রকৃত রিজিকদাতা একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ বলেন—
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬)
৪. ইস্তিগফার ও দোয়ায় মন দেওয়া
অভাবের মুহূর্তে মানুষের দ্বারে দ্বারে ছোটাছুটি না করে সবার আগে মহান রবের সামনে হাত তোলা উচিত। আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার সংকীর্ণ রিজিকের দুয়ার খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ
‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন।’ (সুরা নুহ: আয়াত ১০-১২)
৫. যা আছে তার ওপর সন্তুষ্ট থেকে শুকরিয়া জানানো
অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে আমরা বিদ্যমান অসংখ্য নিয়ামতকে ভুলে যাই। অর্থ কম থাকলেও সুস্থ শরীর, মাথার ওপর ছাদ কিংবা পরিবারের ভালোবাসা অনেক বড় সম্পদ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
‘আর তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তার সংখ্যা নিরূপণ করতে পারবে না।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ১৮)
৬. সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে তুলনা বন্ধ করা
অন্যের চমৎকার বাড়ি, নতুন গাড়ি কিংবা বিলাসী জীবন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করা মানসিক অশান্তির মূল কারণ। নিজের চেয়ে নিচের স্তরের মানুষদের দেখে সন্তুষ্ট থাকাই ইসলামের শিক্ষা। হাদিসে পাকে এসেছে—
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلاَ تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لاَ تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ
‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থানের মানুষদের দিকে তাকাও, ওপরের স্তরের লোকদের দিকে তাকিও না। এতে তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করার মানসিকতা তৈরি হবে।’ (বুখারি ৬৪৯০, মুসলিম ২৯৬৩)
৭. সম্পদের স্বল্পতায় নিজেকে হীনমন্য না ভাবা
ইসলামে মানুষের প্রকৃত মূল্য অর্থের অঙ্কে মাপা হয় না, বরং মনের তাকওয়া ও আমল দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। বিষয়টি আল্লাহ তাআলা এভাবে তুলে ধরেছেন—
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১৩)
৮. প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সহায়তা নেওয়া
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। চরম সংকটে কোনো প্রকার অহমিকা না রেখে আত্মীয়স্বজন বা বিশ্বস্ত মানুষের সহযোগিতা চাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক।
৯. অর্থ না থাকলেও সৎকাজের মাধ্যমে সওয়াব অর্জন
দান-সদকা কেবল টাকা দিয়েই হয় না। শ্রম দেওয়া, অন্যকে ভালো পরামর্শ দেওয়া কিংবা অন্তত নিজের মন্দ আচরণ থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখাও সদকার শামিল। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে—
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ... يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ... يَأْمُرُ بِالْخَيْرِ... يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ فَإِنَّهَا لَهُ صَدَقَةٌ
‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর সদকা করা আবশ্যক... (অর্থ না থাকলে) সে অভাবগ্রস্ত-বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করবে... সৎকাজের আদেশ দেবে... এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে; কেননা এটিও তার জন্য একটি সদকা।’ (বুখারি ১৪৪৫, মুসলিম ১০০৮)
১০. আল্লাহর অসীম রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
অভাব যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা কখনো চিরস্থায়ী নয়। রাতের বুক চিরে যেমন ভোরের আলো ফোটে, তেমনি প্রতিটি সংকটের সমাপ্তি ঘটে নতুন সম্ভাবনায়। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে এভাবে আশ্বস্ত করেন—
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
‘অতএব নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ: আয়াত ৫-৬)
দিনশেষে অভাব কোনো অভিশাপ নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে তা আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ পাঠশালা হয়ে উঠতে পারে। একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো হালাল উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা জারি রাখা, ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং রবের প্রতিটি ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। সংকটের এই ক্ষণস্থায়ী দিনগুলো আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের মাধ্যমে পার করতে পারলেই দুনিয়াতে মিলবে যেমন স্বচ্ছলতা তেমনি আখিরাতের অনন্ত জীবনে মিলবে অসীম প্রশান্তি ও চিরস্থায়ী সাফল্য।

