Logo
Logo
×
   

জাতীয়

লাগেজ সিন্ডিকেট

বিমানে শাজাহান-শামিমা দম্পতির দাপট

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

বিমানে শাজাহান-শামিমা দম্পতির দাপট

বিমানের কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাজাহান ও তার স্ত্রী শামিমা পারভীন।

বিমানের কুয়েত স্টেশনে এক্সেস ব্যাগেজ চুরির ঘটনায় স্টেশন ম্যানেজারকে রক্ষায় কৌশলী ও দায়সারা প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও ব্যাগেজ চুরির জন্য কারা দায়ী তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং ‘তদন্তের সীমাবদ্ধতা’র অজুহাতে দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।  

এ ধরনের দায়িত্বহীন তদন্ত বিমানের আর্থিক ক্ষতি ও বিদেশি স্টেশনগুলোতে দুর্নীতির সংস্কৃতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে মনে করছেন তারা।

জানা গেছে, ঢাকাগামী কুয়েত ফ্লাইটের যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও প্রমাণের অভাবে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছিল না। এমন বাস্তবতায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ঝটিকা তল্লাশি করেন বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএম মেজর ফারহান তানভীর।

এর দুদিন পর তিনি বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, কুয়েত থেকে আসা বিমানের বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটটি ঢাকা অবতরণের পর বেল্টে থাকা ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করা হয়। 

এতে দেখা যায়, ১৪ জনের মধ্যে ১২ জন যাত্রীই নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ওজনের পণ্য বহন করে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কুয়েত স্টেশনে তাদের এই অতিরিক্ত ওজনের জন্য প্রযোজ্য কোনো ফি বা রাজস্ব আদায় দেখায়নি। এমনকি তল্লাশিকৃত কোনো যাত্রীর কাছ থেকেই অতিরিক্ত ওজন বহনের জন্য সরকারি ফি পরিশোধের কোনো রসিদও (রিসিট) পাওয়া যায়নি। 

নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীর অতিরিক্ত পণ্যের রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু না। তখনই ধারণা করা হয়েছিল কুয়েত স্টেশন ম্যানেজারের পকেটে গেছে সরকারের রাজস্বের অর্থ।

তদন্ত সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, বিমানের কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাজাহান (পি-৩৬৪৮৯) একাই নন, লুটপাটের দুর্গে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে তার স্ত্রী শামিমা পারভীনকেও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসাবে পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন। পরে তাকে কুয়েত স্টেশনেই পদায়ন করা হয়। 

একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালনের এমন ঘটনা বিমানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ বিষয়ে মো. শাজাহানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘নামাজে যাচ্ছেন’ বলে এড়িয়ে যান এবং পরে এসে ‘কিছু জানেন না’ বলে ফোন রেখে দেন।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরাসরি কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার শাহজাহানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি তেমনি তাকে স্পষ্টভাবে নির্দোষও বলা হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘যেহেতু ঘটনাটি কুয়েত স্টেশনের, তাই ঢাকায় বসে এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।’ তবে প্রতিবেদনের শেষ অংশে কমিটি স্বীকার করেছে, উক্ত ঘটনায় ‘বিচ্যুতি’ বা অনিয়ম দেখা গেছে। 

এর জন্য কুয়েত স্টেশনকে ‘অ্যাকাউন্টেবল’ বা জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কমিটির এমন দ্বিমুখী ও গোঁজামিলের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিমানের অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও বিমানের উপব্যবস্থাপক (হিসাব) সাজ্জাদুল ইসলাম নাসির বলেন, তদন্তের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে দায়ীদের পূর্ণাঙ্গভাবে শনাক্ত বা অনিয়মের পরিধি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কাউকে নির্দোষও বলিনি। এই ফ্লাইটে অতিরিক্ত লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বা বিচ্যুতি ঘটেছে এটি আমরা তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রভাবশালী এ দম্পতির প্রভাব অটুট রয়েছে। মোহাম্মদ শাজাহান এবং তার স্ত্রী শামীমা পারভীনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আদম পাচার, অতিরিক্ত লাগেজের নামে রাজস্ব ফাঁকি, চোরাচালান এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অনিয়ম হয়ে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা বিভাগের আকস্মিক তল্লাশি এবং ১২ জন যাত্রীর অতিরিক্ত ওজনের লাগেজ রসিদ ছাড়াই বহনের মতো অকাট্য প্রমাণ ছিল। সেখানে ‘ঢাকায় বসে তদন্ত করে ‘সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি’-এমন মন্তব্য হাস্যকর। 

কুয়েত স্টেশনের ক্ষমতাধর ম্যানেজার ও তার স্ত্রীকে রক্ষা করতেই তদন্ত কমিটি দায়সারা প্রতিবেদন দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার বেলারুশ সফরে সফরসঙ্গী ছিলেন শামিমা পারভীন। এছাড়া শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী সেলিনা রহমান এবং গাইবান্ধার সাবেক সংসদ-সদস্য মাহাবুব আরা গিনির প্রোটোকলের দায়িত্বও পালন করেন। রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি রেজাউল হক রেজার চাচাতো বোন শামিমা। 

এছাড়া সিরাজগঞ্জ-৩ (তাড়াশ-রায়গঞ্জ) আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ-সদস্য ডা. আজিজুর রহমানের সঙ্গেও তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে।

শামিমার স্বামী শাজাহানের বিরুদ্ধে অনিয়মের ইতিহাসও পুরনো। ২০১২ সালে জাল ভিসায় রোম ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর সময় হাতেনাতে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়েন তিনি। বিমানের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আতিক সোবহান তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী সেলিনা রহমানের প্রভাব খাটিয়ে সেই ফাইলটি গায়েব করে দেন।

নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের মেয়াদ শেষ হলেও প্রভাবশালী মহলের দাপট দেখিয়ে শাজাহান এখনো কুয়েত স্টেশনেই বহাল আছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই দম্পতি দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেন। এখন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে অতীতের ‘পাপ’ মোচনের চেষ্টা করছেন। 

এসব বিষয়ে জানতে শামিমা পারভীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনি জবাব দিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেননি।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপক (ফরেন স্টেশন) রোকসানা রিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি বর্তমানে ছুটিতে আছি। প্রতিবেদনে ঠিক কী লিখেছিলাম এই মুহূর্তে মনে নেই। তদন্তে আমার দায়িত্বও খুব সীমিত ছিল। তাই এ বিষয়ে এখন নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছি না।

বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে। বিস্তারিত দেখে পরে জানাতে পারব।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .