স্মরণসভায় বক্তারা
নুরুল ইসলাম আমাদের মাঝে বিচরণ করছেন আলোকবর্তিকা হয়ে
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গভীর শোক, বিনম্র শ্রদ্ধা এবং হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামকে স্মরণ করা হয়েছে। তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা ও দোয়া সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে যমুনা টেলিভিশন অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বক্তারা বলেন, নুরুল ইসলাম ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তিনি সৎভাবে ব্যবসা করেছেন, ঋণখেলাপি হননি। সততাই ছিল সাহসের উৎস। রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি কখনোই, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। ছোট্ট জীবনে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান গড়ে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে গেছেন। নুরুল ইসলাম তার কর্মের মধ্য দিয়ে আজও আমাদের মাঝে বিচরণ করছেন আলোকবর্তিকা হয়ে।
দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম।
যমুনা গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মনিকা নাজনীন ইসলাম, গ্রুপ পরিচালক এসএম আবদুল ওয়াদুদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু হয়। তিলাওয়াতের পর প্রয়াত নুরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
এরপর প্রয়াত নুরুল ইসলামের স্মৃতিচারণ করে বক্তৃতা করেন যমুনা গ্রুপ, যুগান্তর ও যমুনা টিভির সিনিয়র কর্মকর্তারা।
যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও যুগান্তরের প্রকাশক সালমা ইসলাম বলেন, ৭১- এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধস্ত পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের কল্যাণে যারা এগিয়ে এসেছেন নুরুল ইসলাম ছিলেন তাদের অন্যতম। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাটা ছিল তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। শুরুতে তার কয়েকটি ছোট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু তিনি এ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। তিনি শিল্প কারখানা গড়ে তোলায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এজন্য তিনি বিরামহীন পরিশ্রম করেছেন। নিজের মেধা, শ্রম ও সাহস দিয়ে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণে একে একে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেন। সেখানে আজ বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি তার কাজের মধ্য দিয়ে আজও আমাদের মাঝে বিচরণ করছেন আলোকবর্তিকা হয়ে।
সালমা ইসলাম বলেন, সহধর্মিণী হিসাবে আমি তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। কারণ স্বামী হিসাবে তিনি আমাকে সম্মান দিতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে কখনো কষ্ট দেননি। জীবিত অবস্থায় নুরুল ইসলাম আমাদেরকে বহু দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আজকে তিনি নেই। কিন্তু তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তার দেওয়া নির্দেশনামাফিক সৎভাবে কাজ করলেই সফলতা ধরা দেবে।

যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, মরহুম নুরুল ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর যদি তিনি যদি আর কিছু নাও করতেন তবুও তার যে গৌরবের আসন সেটি চিরকাল নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকতো। কিন্তু তিনি যুদ্ধবিধস্ত দেশে নতুন স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করলেন। আমি মাঝেমধ্যে ভাবি, এত কম সময়ে এতোকিছু তিনি কীভাবে করলেন। জুলাই বিপ্লবের রক্তে রঞ্জিত এই মুক্ত বাংলাদেশে আমরা আজকে তার অভাব প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছি।
তিনি বলেন, নুরুল ইসলাম ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তিনি সৎভাবে ব্যবসা করেছেন, ঋণখেলাপি হননি। সততাই ছিল সাহসের উৎস। রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি কখনোই, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। ছোট্ট জীবনে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান গড়ে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে গেছেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন-যুগান্তরের সাবেক সম্পাদক সাইফুল আলম, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ, যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন, যুগান্তর যুগ্ম সম্পাদক বিএম জাহাঙ্গীর, এবং যমুনা টেলিভিশনের হেড অব নিউজ তৌহিদুল ইসলাম।
স্মরণসভায় দৈনিক যুগান্তরের সাবেক সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, যমুনা গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাবুলের বিস্তৃতি সীমাহীন। কোন সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমরা তাকে আবদ্ধ করতে পারি না।
তিনি বলেন, আমরা তার সাহসিকতা, সততা, পরিশ্রম, বিশ্বাস ও দর্শনের কথা বলি, সব তার নিজের কথা, কর্ম ও জীবনাচারের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুটিত হয়েছে। তার যাপিত জীবনের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুটিত হয়েছে। এটি একটি মানুষের অনেক বড় দিক। তিনি সব ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। আমি মনে করি সফল জীবনের অধিকারী অনেক মানুষ আছে সমাজে কিন্তু সার্থক জীবন খুব কম মানুষ পায়, সেটি নুরুল ইসলাম বাবুল পেয়েছেন। তার জীবন সার্থক আমি মনে করি।
যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ নুরুল ইসলাম বাবুলের সাহসিকতার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, এ মানুষটি যে সাহস দেখিয়ে গেছেন, সাহসের বীজ রোপণ করে গেছেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনো সেটা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। অনেকেই বলেন, ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে এত সাহস কোথায় পেয়েছি? আমি বলি, এটা নুরুল ইসলাম বাবুল সাহেব দিয়ে গেছেন। কিনি যে সাহস সঞ্চারিত করে গেছেন, সেটা আমরা এখনো বয়ে বেড়াই। যতদিন সাংবাদিকতা করবো, এ সাহস নিয়েই করব।
যমুনা গ্রুপের বর্তমান যোগ্য নেতৃত্ব প্রসঙ্গে ফাহিম আহমেদ বলেন, তিনি এমন উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যারা পুরোপুরি ব্যবসা রপ্ত করতে পেরেছেন এবং তার ধারাবাহিকতা বয়ে চলেছেন। আমরা অনেক গ্রুপে দেখি, বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে সন্তানরা ব্যবসা ধরে রাখতে পারেন না কিংবা এগিয়ে নিতে পারে না। কিন্তু তিনি সেভাবেই যোগ্য করে তৈরি করেছেন, সেটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের এবং ভালো লাগার। তিনি চাইতেন যমুনা টেলিভিশন যেন পৃথিবীতে শীর্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সেটা ধারণ করেছি এবং আপোষহীনভাবে চলি।
যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন বলেন, আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী ছিলেন নুরুল ইসলাম। এত অল্প সময়ে তার চলে যাওয়াটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আজকের যে বাংলাদেশের পরিবর্তন এটি দেখার তার খুব ইচ্ছে ছিল। কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী।
তিনি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। মানুষের চেহারা দেখে তিনি তার অবস্থা বা চরিত্র বুঝতে পারতেন। কর্মজীবনে আমরা তার এসব কথার বাস্তবতাও দেখেছি।
তিনি বলেন, ১৩ জুলাই বছরের একটি দিন, একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি আজকে ফজরের সময় চেয়ারম্যান স্যারের জন্য নামাজ পড়ে অন্তর থেকে দোয়া করে থাকি, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় স্মরণ। চেয়ারম্যান স্যারের যত কাজ, আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তেই ফুটিয়ে তুলতে পারি, তাহলেই মনে করব চেয়ারম্যান স্যারকে স্মরণ করাটা সঠিকভাবে হবে। আর যদি বছরে একটা দিন আমরা এই কালো ব্যাজ লাগাই, বক্তৃতা দিই, চলে যাই কিংবা ফেসবুকে পোস্ট দিই- সেটি কেবলই লৌকিকতা। তাতে কিচ্ছু হবে না।
বি এম জাহাঙ্গীর বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। কেউ বলেন- তিনি শিক্ষকের মতো, বাবার মতো ছিলেন। সব চরিত্রই তাকে দেওয়া যাবে। সবাই তো তার রাগ দেখেছেন, কিন্তু তার ভেতরে যে একটা বিশাল হৃদয় ছিল, তার যে হাসি- এই হাসি যারা কাছ থেকে দেখেননি, তারা অনেক কিছু মিস করেছেন। টাইম ম্যানেজমেন্ট কাকে বলে, কাজের প্রতি নিষ্ঠা কাকে বলে- তা তাকে না দেখলে বোঝা যেত না। তিনি সবার আগে অফিসে আসতেন এবং যেতেন সবার পরে।
যমুনা টেলিভিশনের হেড অফ নিউজ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নুরুল ইসলামের জীবনে একটি প্রেরণা ছিল তিনি কিছু একটা করতে চান বদলে যেতে চান বদলে দিতে চান। নীতির ক্ষেত্রে অটল ছিলেন তিনি। তিনি যা চাইতেন সোজাসাপটা বলতেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি এত এত বড় মানুষদের চ্যালেঞ্জ করেছেন যা অনেকটা বিস্ময়ের মতো। যেগুলো স্বপ্ন দেখতেন সেগুলো তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। এটি সফল হয়েছে তার নিরলস প্রচেষ্টার কারণে। কাজের ব্যাপারে তার কোনো ক্লান্তি ছিল না। আমাদের মরহুম চেয়ারম্যান যা শিখিয়ে গেছেন দেখিয়ে গেছেন, তার রেখে যাওয়া আদর্শ অনুযায়ী আমরা আমাদের সাধ্যমতো তা অনুসরণের চেষ্টা করব।
উপস্থিত ছিলেন— যুগান্তরের ডেপুটি এডিটর আসিফ রশীদ, বার্তা সম্পাদক জোহায়ের ইবনে কলিম, নগর সম্পাদক মিজান মালিক, সম্পাদকীয় ও ফিচার বিভাগের প্রধান হাসান শরীফ, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক (মফস্বর ইনচার্জ) নাঈমুল কবির, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক (অনলাইন ইনচার্জ) আতাউর রহমান, বিশেষ প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম, কাজী জেবেল, শাহেদ সিদ্দিকী, সহযোগী সম্পাদক মাহবুব কামাল, সহকারী সম্পাদক জুন্নু রাইন, ফিচার ইনচার্জ সেলিম কামাল, মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ অমিত হাসান রবিন প্রমুখ।
আলোচনা সভা শেষে দোয়া পরিচালনা করেন যুগান্তরের সহ সম্পাদক মুফতি মাওলানা তোফায়েল গাজালি।
এর আগে সকালে বনানীতে প্রয়াত নুরুল ইসলামের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও তারই হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপ, দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশনের কর্মকর্তারা।
এ সময় মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
নুরুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত ও দোয়া মোনাজাত করেন তার সহধর্মিনী যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম ইসলাম।
সকাল সোয়া ৯টায় যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার, সাবেক সম্পাদক সাইফুল আলম, যুগান্তরের যুগ্ম-সম্পাদক বিএম জাহাঙ্গীর, যমুনা টেলিভিশনের হেড অব নিউজ তৌহিদুল ইসলাম, যুগান্তরের নগর সম্পাদক মিজান মালিক প্রমুখ।
২০২০ সালের ১৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নুরুল ইসলাম ইন্তেকাল করেন। পরের দিন ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আপসহীন এই যোদ্ধা।
