স্বাস্থ্যমন্ত্রী
বিগত নির্বাচনগুলোতে ডিসি-ইউএনও-ওসিকে ঘুস দেওয়া হতো
যুগান্তর প্রতিবেদন, মানিকগঞ্জ
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
মানিকগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থ দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, বিগত আমলে নির্বাচনের সময় থানার পরিধি অনুযায়ী ইউএনওকে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, ওসিকে ১ কোটি টাকা এবং ডিসিকেও বিপুল অঙ্কের অর্থ দেওয়া হতো। তবে এবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কাউকে ১০ টাকাও দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের সেই ‘ঘুস-দুর্নীতির মহারণ্য’ থেকে দেশ বেরিয়ে আসছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার দুপুর ১২টায় মানিকগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিগত আমলে ইলেকশন হয়েছে। আমি ফ্র্যাংকলি একটা কথা বলি- নির্বাচন এলে ইউএনও সাহেব পেতেন ন্যূনতম ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, থানার পরিধি ভেদে। ওসি সাহেব পেতেন ১ কোটি, ডিসি সাহেবও পেতেন। সব ছিল ঘুসের দুর্নীতির মহারণ্য। এবার একটা ইলেকশন হয়েছে, ১০ টাকা কেউ পেয়েছেন? আমি দেই নাই কাউকে ১০ টাকা, চায়ও নাই।
মন্ত্রী বলেন, আগের তুলনায় এবার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বেশি কাজ করেছেন। কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রেখেছেন। অতীতে কর্মকর্তাদের একদিকে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে খুশি রাখতে অনৈতিক সুবিধা নিতে বাধ্য করা হতো।
মন্ত্রী বলেন, নিতে হবে, নেন; চুরি করতে হবে, নেন- এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সেই দিনগুলো এখন চলে গেছে। সবাইকে বুঝতে হবে, ইমান ও পবিত্রতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী অতীতের প্রশাসনিক দুর্নীতির আরেকটি চিত্র তুলে ধরে বলেন, আগে ঠিকাদাররা মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশের জন্য পিয়নদেরও টাকা দিতেন। নার্স ও চিকিৎসকদের বদলির ক্ষেত্রেও ঘুসের নির্দিষ্ট অঙ্ক ছিল। নার্সের ট্রান্সফার ও ডাক্তারের ট্রান্সফার ৩ লাখ, ৫ লাখ। ডাইরেক্টর হলে ২ কোটি। এরকম ঘুস খেয়েছে।
তিনি বলেন, টোটাল সিনারি ওয়াজ ফুল অব করাপশন। এগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা বেরিয়ে আসছি, ইনশাআল্লাহ। কাজেই এই কাজটা কিন্তু একার না, সমন্বিত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন ধরনের জুয়ার কারণে সমাজে অপরাধ বাড়ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে হবে। মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো মাদকসেবী কিংবা মাদক ব্যবসায়ীকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ না থাকলে আমাদের কারও অস্তিত্ব থাকবে না। অনেক রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশের জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগের মূল্য রক্ষা করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও ২৪ এর গণতন্ত্র রক্ষায় যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্যখাতে নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। বেসিক সরকার সরঞ্জাম এর নামে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হবে। রোগীদের খাবারের মান উন্নয়ন করা হবে। ডায়ালাইসিস রোগী ও শিশুদের জন্য পৃথক বেডসহ বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে নতুনভাবে সাজিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। ইউনিয়ন পর্যায়েও স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক সেবা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল দায়িত্ব।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম রিতা বলেন, মানিকগঞ্জ জেলাকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এজন্য সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এসএ জিন্নাহ কবির এবং মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম প্রমুখ।
এছাড়া জেলার সব সরকারি দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
