Logo
Logo
×
   

জাতীয়

সিপিডির গবেষণা

ই-গভর্ন্যান্সের পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় সরকার সেবাগ্রহীতারা

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

ই-গভর্ন্যান্সের পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় সরকার সেবাগ্রহীতারা

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ই-গভর্ন্যান্সের প্রসার ঘটলেও জনগণ এখনো এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। 

সোমবার গুলশানের একটি হোটেলে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ই-গভর্ন্যান্স : বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনলাইনে শেষ করতে পেরেছেন। নারীদের ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ সেবার অধিকাংশ ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করলেও কিছু কাগজপত্রের জন্য তাদের অফলাইন প্রক্রিয়ায় যেতে হয়েছে। ৩৮ শতাংশ নারী শুধু অনলাইনে আবেদনপত্র জমা দিতে পেরেছেন; পরবর্তী সব ধাপ অফলাইনে সম্পন্ন করতে হয়েছে। আর ২০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী অনলাইনে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সেগুলো আবার সরাসরি দপ্তরে জমা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

তরুণদের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনলাইনে শেষ করতে পেরেছেন মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ সেবার অধিকাংশ ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করলেও কিছু কাগজপত্রের জন্য তাদের অফলাইনে যেতে হয়েছে। ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ শুধু আবেদনপত্র অনলাইনে জমা দিতে পেরেছেন এবং ১৭ দশমিক ৮ শতাংশকে অনলাইনে জমা দেওয়া কাগজপত্র আবার সরাসরি দপ্তরে জমা দিতে হয়েছে।

নারীদের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশকে কাগজপত্র জমা এবং ৫১ দশমিক ৮ শতাংশকে কাগজপত্র সংগ্রহ করতে সশরীরে সরকারি দপ্তরে যেতে হয়েছে। ২৮ দশমিক ৯ শতাংশকে সরাসরি স্বাক্ষর এবং ২২ দশমিক ৩ শতাংশকে অফলাইনে অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ঘুস দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী।

অন্যদিকে, তরুণদের ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশকে কাগজপত্র জমা এবং ৫১ দশমিক ৯ শতাংশকে কাগজপত্র সংগ্রহ করতে সরকারি দপ্তরে যেতে হয়েছে। ৩০ শতাংশকে সরাসরি স্বাক্ষর এবং ২৪ দশমিক ৩ শতাংশকে অফলাইনে অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ঘুস দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৫ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ।

গবেষণায় অঞ্চলভেদে ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতির বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের দপ্তরগুলোর প্রস্তুতি সূচকে ৫৭ দশমিক ৩ স্কোর নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ প্রথম এবং ৪৯ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ৭২ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে রাজশাহী প্রথম এবং ৬২ স্কোর নিয়ে সিলেট দ্বিতীয়। উভয় পর্যায়েই সবচেয়ে পিছিয়ে রংপুর বিভাগ। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভাগটির স্কোর ৮ দশমিক ৮ এবং উপজেলা পর্যায়ে ১২ দশমিক ৩।

সংলাপে জানানো হয়, গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ২ হাজার ৬১১ জন নাগরিক অংশ নেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৮২ জন তরুণ, ৯৫৭ জন নারী, ৮১ জন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, ৫৯ জন চরাঞ্চলের বাসিন্দা, ৫৬ জন হাওড়াঞ্চলের বাসিন্দা, ৩৩ জন বস্তিবাসী এবং ৪৩ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। এছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। 

গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, অনলাইনে সেবা গ্রহণের হার বাড়াতে হলে আবেদন, যাচাই, অর্থ পরিশোধ, প্রক্রিয়াকরণ, যোগাযোগ ও চূড়ান্ত সেবা প্রদান এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে। প্রতিটি দপ্তরে আইসিটি ফোকাল পয়েন্ট রাখার পাশাপাশি অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের তদারকিতে নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী সংগঠনকে যুক্ত করতে হবে। অনলাইনে সেবা দেওয়ার উদ্যোগ সফল করতে হলে সব স্তরের ও সব শ্রেণির মানুষকে সেবার আওতায় আনতে হবে। 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের পরিবার, প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষকেও সেবার বাইরে রাখা যাবে না। বাংলা ভাষার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় সেবাসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। কণ্ঠনির্ভর ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

তিনি বলেন, অভিযোগ জানানো, অভিযোগের অগ্রগতি দেখা এবং আপিল করার কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তবে শুধু প্রযুক্তি নয়; নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণার আওতায় ২৯৭টি সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান না হওয়ায় সেগুলোকে প্রস্তুতি সূচকের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে ২৬৭টি স্থানীয় সরকারি দপ্তরের তথ্য নিয়ে ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতি সূচক তৈরি করা হয়েছে। এসব দপ্তরের সামগ্রিক প্রস্তুতি সূচকে ১০০-এর মধ্যে স্কোর এসেছে ৩৮ দশমিক ৯।

অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে স্কোর ২৪ দশমিক ১, পরিচালনাগত প্রস্তুতিতে ৪৪ এবং নাগরিকমুখী ই-সেবা প্রস্তুতিতে ৪৮ দশমিক ৬।

গবেষণায় ই-গভর্ন্যান্সের পথে বড় বাধা হিসাবে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রের অভাব ও দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নারীদের ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এবং ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগকে ই-সেবা গ্রহণের বাধা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। 

এছাড়া ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অভাবের কথা জানিয়েছেন। আর তরুণদের ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি, ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অভাবকে ই-সেবা গ্রহণের বাধা হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সংলাপে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ। গবেষণা সহযোগী ছিলেন সাবিহা শারমিন। গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম