Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

অনুসন্ধানে দুদক

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সুইস ব্যাংকেও টাকা রাখার অভিযোগ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সুইস ব্যাংকেও টাকা রাখার অভিযোগ

Advertisement

একদিকে নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য; অন্যদিকে টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন। এর সঙ্গে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে ভিলা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ। 

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে এমন বিস্তর অভিযোগের নতুন একটি অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

অভিযোগে আর্থিক অনিয়ম ও লেনদেনের যেসব অঙ্ক যোগ করলে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। শনিবার দুদকের সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ (জনসংযোগ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

দুদক জানায়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো- দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার। বাকি অর্থের অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ, প্রকল্প, টেন্ডার ও ঘুস লেনদেন ঘিরে। 

এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ৪ জনের দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বদলি, কেনাকাটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমেসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। 

দুদক জানায়, আগের অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগটি সংযুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

ডিসি পদায়নে টাকা লেনদেন: দুদক বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। একই ভাবে সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। ৩৬ জনের ক্ষেত্রে অভিযোগে উলে­খিত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ অঙ্ক হিসাবে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা। বিষয়টি অনুসন্ধানে যাচাই করবে দুদক। 

এছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা বাড়ানোর অভিযোগ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবেদনে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। 

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ওই প্রকল্পের বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

১০ কোটি টাকা ঘুসে ওয়াসার এমডি নিয়োগ: ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসাবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার বিষয়টিও অনুসন্ধান করছে দুদক। এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসাবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

বিদেশে ১১ হাজার কোটি পাচার: আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ পড়েছে দুদকে। এই চার দেশে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা। 

এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

দুদকে দেওয়া আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের দুই বোন জামাই ও এক ভাগিনার মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।

অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। 

তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুস লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও অভিযোগে উলে­খ করা হয়েছে। 

পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব বিষয়েই অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

আগের অনুসন্ধানে যা ছিল: এর আগেও আসিফ মাহমুদসহ সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

ওই অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। 

এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগের কথাও বলা হয়। চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিমকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এখন বড় পরিসরে অনুসন্ধান: নতুন অভিযোগে একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং চার দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ একসঙ্গে এসেছে। বিশেষ করে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের তথ্য থাকায় বিষয়টি বড় পরিসরে অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।

অভিযোগ অস্বীকার আসিফ মাহমুদের: এদিকে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। 

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘দুদক সংস্কার না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখনো আগের মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে।’

১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নাম্বারটা একটু আগে ঠিকমতো উনারা নিজেরা বসে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। একবার শুনি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যেটা আমার দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেটও ছিল না। এরপর একবার শুনি ১১ হাজার কোটি টাকা। কয়েকদিন আগে শুনলাম ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২ কোটি ৭৬ লাখ থেকে ১১ হাজার কোটিতে উঠে যায়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের নিজেদের মধ্যে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘এখন সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে কাউকে তারা পাকড়াও করবে, তাহলে এর অনেক পদ্ধতি আছে। আমরা দেখছি আগে দুদক কী কী করছে। বিএনপির ওপরেই করেছে। আওয়ামী লীগের সময়ের দুর্নীতি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’

এছাড়া অভিযোগ নিয়ে ফেসবুকে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন আসিফ মাহমুদ। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’ 

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম