বাংলাদেশে গলফের নতুন অধ্যায়ের সূচনা
Advertisement
নজরুল হোসেন আয়ন
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গলফ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে। সেদিন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের (বিজিএফ) নির্বাহী কমিটির প্রথম নির্বাচন। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এই খেলাটির জন্য এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি দেশের গলফের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক।
বাংলাদেশে গলফের বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতন্ত্র কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। অন্যান্য অনেক খেলার তুলনায় এ দেশের গলফের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পর্ক গভীর। দেশের বেশির ভাগ গলফ কোর্সই ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরে অবস্থিত। কুর্মিটোলা, ভাটিয়ারি, সাভার, রংপুর কিংবা ময়নামতী—এই সব কোর্সকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের গলফ সংস্কৃতি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এই খেলাকে এগিয়ে নিতে অবকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছে—যেখানে আর্থিক লাভের বিষয়টি কখনোই মুখ্য হয়ে ওঠেনি।
নবনির্বাচিত বিজিএফ নির্বাহী কমিটির সামনে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানোই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কেউই নতুন নন; তারা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে গলফের সঙ্গে যুক্ত, অভিজ্ঞ সংগঠক এবং এই খেলাটির নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। তাদের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদ তৈরি করে।
এই নেতৃত্বের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি গলফকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিভিন্ন গলফ ক্লাবের সঙ্গে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা, তরুণ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেওয়া এবং গলফ কমিউনিটিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন, “যুবসমাজ যদি খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে তারা বিপথে যাবে না।” এই বক্তব্য খেলাধুলার সামাজিক গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গলফ এমন একটি খেলা, যা শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক সম্মান শেখায়—যার প্রভাব মাঠের বাইরেও বিস্তৃত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের গলফের ভবিষ্যৎ জাতীয় যুব উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গলফ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। সিদ্দিকুর রহমানের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে সেই সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। এখন প্রয়োজন তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য শক্তিশালী উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা।
যুব উন্নয়ন এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে গলফ কর্মসূচি চালু করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে খেলাটির প্রতি আগ্রহ বাড়বে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিনি গলফ বা ড্রাইভিং রেঞ্জ স্থাপন করা গেলে সাধারণ মানুষের কাছেও খেলাটি পৌঁছানো সহজ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গলফ সরঞ্জামের উচ্চ মূল্য। ক্লাব, বল এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় শুরুতেই নিরুৎসাহিত হয়। এই বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে যদি শুল্ক কমানো যায়, তবে খেলাটির বিস্তার আরও সহজ হবে।
একই সঙ্গে নিয়মিত আন্তর্জাতিক পেশাদার টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ অতীতে এশিয়ান ট্যুরের মতো বড় প্রতিযোগিতা সফলভাবে আয়োজন করেছে। নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে ক্রীড়া পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে গলফ পর্যটনকে একটি কৌশলগত খাত হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেরও সুন্দর গলফ কোর্স এবং প্রাণবন্ত গলফ কমিউনিটি রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারের মাধ্যমে এই খাতটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব।
বাংলাদেশের গলফ কমিউনিটির অনেকের প্রত্যাশা—নবনির্বাচিত কমিটি অতীতের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করবে। সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহায়তা, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং কর্পোরেট ও গণমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গলফের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক।
বাংলাদেশের গলফ এখন তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ টি-বক্সে দাঁড়িয়ে। পরবর্তী শটই নির্ধারণ করবে খেলাটি কত দূর এগোতে পারবে।
লেখক: গলফার ও দ্য গলফহাউস ম্যাগাজিনের সম্পাদক।
