Logo
Logo
×
   

খেলা

পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া নকআউটের মহারণ

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া নকআউটের মহারণ

সংগৃহীত ছবি।

নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। শুধু শেষ বত্রিশের লড়াই নয়, সময়ের বিরুদ্ধে দুই কিংবদন্তির যুদ্ধ। এক পাশে রোনাল্ডো , অন্য পাশে লুকা মদ্রিচ। তাদের কারও শেষ বিশ্বকাপ।

কানাডার টরন্টো স্টেডিয়াম চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট ভেন্যু। আসনসংখ্যা ৪৩ হাজার ৩৬ জন। পাঁচটি গ্রুপ ম্যাচে গ্যালারি ছিল পূর্ণ, পরিবেশ ছিল অভাবনীয় । বিশ্বকাপের জন্য প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ব্যয়ে সংস্কার করা এই মাঠ এখন প্রস্তুত তার শেষ ও সবচেয়ে বড় রাতের জন্য।  

একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম ভাগ করা দুই কিংবদন্তি এবার মুখোমুখি। একজন গোলকে ইতিহাসে পরিণত করেছেন, আরেকজন সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে ফুটবলকে শিল্প বানিয়েছেন।

পর্তুগালের গ্রুপ পর্ব ছিল অসম ছন্দের। গ্রুপ ‘কে’ থেকে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠেছে তারা। শুরুতে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১–১ গোলের ড্র। এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫–০ গোলের দুর্দান্ত জয়। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য সমতা। তিন ম্যাচে অপরাজিত থাকলেও দলটি এখনও নিজেদের সেরা রূপ পুরোপুরি দেখাতে পারেনি। তিন ম্যাচে করেছে ৬ গোল, হজম করেছে মাত্র ১টি। বলের নিয়ন্ত্রণে ছিল ধারাবাহিক, কিন্তু আক্রমণে ওঠানামা ছিল স্পষ্ট।  

দলের সবচেয়ে বড় আলো এখনও রোনাল্ডো। বয়স এখন ৪১। বিশ্বকাপ এখনও তাকে বিদায় বলতে পারেনি। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি গড়েছেন নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন। বিশ্বকাপে তার গোল এখন ১০। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ গোলসংখ্যায় তিনি পেরিয়ে গেছেন ইউসেবিওকেও। ইতিহাসের পাতা তার জন্য জায়গা রেখে দিচ্ছে।  

পর্তুগাল শুধু রোনাল্ডোর দল নয়। রবার্তো মার্তিনেজের হাতে আছে বৈচিত্র্যময় আক্রমণভাগ। ব্রুনো ফার্নান্দেজ খেলার ছন্দ তৈরি করেন। বার্নার্দো সিলভা জায়গা বদলে আক্রমণকে প্রাণ দেন। ভিতিনিয়া মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ আনেন। জোয়াও নেভেস সাহস নিয়ে খেলেন। পরিকল্পনা পরিষ্কার। বল নিজেদের কাছে রাখা, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা, তারপর ফাঁক খুঁজে আঘাত করা। পরিসংখ্যানে মাঝমাঠই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।  

ম্যাচের আগে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেছেন, এই নকআউট পর্ব নতুন এক বিশ্বকাপের শুরু। ক্রোয়েশিয়ার মতো অভিজ্ঞ দলের বিপক্ষে ভুলের সুযোগ নেই। রোনাল্ডো ও মদ্রিচকে সময়ের সীমা ভেঙে যাওয়া ফুটবল ব্যক্তিত্ব।   

অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট। গত আসরে তৃতীয় স্থান। গ্রুপ ‘এল’ থেকে ছয় পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়ে এসেছে। শুরুতে ইংল্যান্ডের কাছে ৪–২ গোলে হার। এরপর পানামাকে ১–০ এবং ঘানাকে ২–১ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দলটি। তিন ম্যাচে করেছে ৫ গোল, হজম করেছে ৫টিই। শুরুতে ধাক্কা খেলেও পরে নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরেছে।  

লুকা মদ্রিচ। বয়স ৪০। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচ পূর্ণ করেছেন। এই বিশ্বকাপে এখনও গোল নেই। কিন্তু তার পায়ের ছোঁয়ায় খেলার গতি বদলায়। পানামার বিপক্ষে জয়ের পর টরন্টোর গ্যালারিতে লাল-সাদা সমুদ্র তাকে উদযাপন করেছে এমন আবেগে, যা ভাষা ছাড়াও বোঝা যায়। ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি অভিজ্ঞতা। কখন গতি কমাতে হয়, ম্যাচকে স্নায়ুর লড়াই বানাতে হয় কিংবা আতঙ্ক নয়, ধৈর্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

ম্যাচের আগে ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেন, এই ম্যাচ শুধু রোনাল্ডো বনাম মদ্রিচ নয়। আসল যুদ্ধ হবে মাঝমাঠে। যে দল কম ভুল করবে, সেই দলই এগিয়ে যাবে। পর্তুগালের বল নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য নিয়েও তিনি সতর্ক। 

চলতি বিশ্বকাপে তারকাদের পারফরম্যান্সও এই ম্যাচকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। রোনাল্ডো ৩ ম্যাচে ২ গোল করে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পর্তুগালকে। ব্রুনো ফার্নান্দেজ আক্রমণ তৈরির কেন্দ্র। ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস বলের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মদ্রিচ এখনও গোল না পেলেও ক্রোয়েশিয়ার খেলার ছন্দ তার পা দিয়েই তৈরি হয়েছে। মার্টিন বাতুরিনা ও পেতার সুচিচ মাঝমাঠে তাকে সমর্থন দিচ্ছেন।  

হেড টু হেডে সাম্প্রতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্তুগাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপে এবারই প্রথম দেখা দুই দলের। আর নকআউট বাস্তবতায় আগের ইতিহাস খুব বেশি গুরুত্ব পায় না।  

কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে মাঝমাঠে। পর্তুগাল বলের নিয়ন্ত্রণ চাইবে। ব্রুনো ও ভিতিনিয়া ছন্দ তৈরি করতে চাইবেন। ক্রোয়েশিয়া চাইবে মদ্রিচের ছোঁয়ায় ম্যাচের গতি ভেঙে দিতে।

দুই দলের বড় টুর্নামেন্টের নকআউট ইতিহাসও আছে। ইউরো ২০১৬তে শেষ ষোলোতে শেষ দেখা হয়েছিল। অতিরিক্ত সময়ে রিকার্দো কোয়ারেসমার গোলে জিতেছিল পর্তুগাল। পরে সেই টুর্নামেন্টেই তারা শিরোপা জেতে।  

জয়ী দল খেলবে স্পেন অথবা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। লেক অন্টারিওর তীরে ছোট্ট টরন্টো স্টেডিয়াম প্রস্তুত। রাত কি হবে রোনাল্ডোর আরেকটি অধ্যায়, নাকি মদ্রিচের আরেকটি বিস্ময়?

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম