অনেক চক্রপূরণের রাতে এটাই বুঝি সবচেয়ে বড় চক্রপূরণ। ২০০৭ সালের এই তরুণ মেসি আর শিশু ইয়ামাল আজ মুখোমুখি বিশ্বকাপের ফাইনালে/ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সবকিছুরই একটা শেষ আছে। কথাটা অমোঘ সত্য। সেই অমোঘ সত্য আপনিও জানেন, আমিও জানি, তবু অবচেতনে কি সেটাকে একটু হলেও এড়িয়ে যেতে চাই না আমরা? চাই তো বটেই। মানুষ হিসেবে আমাদের আদি পাপগুলোর একটা– ‘লোভ’, সে লোভের বশে যে অল্পে আমাদের মন ভরে না!
সেই লোভকে একপাশে সরিয়ে রাখাই প্রকৃতির নিয়ম। আজ রাতে, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, প্রকৃতি সেই নিয়ম পালন করবে কি না, কে জানে। লিওনেল মেসি মাঠে নামবেন, আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে। হয়তো শেষবারের মতো। কে জানে!
ফাইনালে নামার সময় মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর ২৫ দিন। ভাবুন তো একবার, ঊনচল্লিশ! যে বয়সে অধিকাংশ ফুটবলার মাঠের কথা ভুলে হাঁটুর ব্যথা নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে বসে থাকেন, সেই বয়সে মেসি এবার গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে। আট গোল, চার অ্যাসিস্ট। আর গতকাল রাত পর্যন্তও তিনিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, একুশ গোল নিয়ে, একাই। আজ হয়তো সেই সিংহাসনটা আরেকটু পোক্ত করবেন। অথবা আর কখনো সেখানে বসাই হবে না। কে জানে!
কিন্তু আসল গল্পটা এখানে নয়। গোল-সংখ্যা কি আর গল্পগুলোকে মেলে ধরতে পারে? গল্প তো থাকে সময়ের ভাঁজে।
সতেরো বছর আগে ফেরা যাক, চলুন। ইউনিসেফের এক প্রোগ্রামে, তরুণ মেসি একটা বাচ্চাকে গোসল করিয়ে দিয়েছিলেন। বাচ্চাটার নাম লামিন ইয়ামাল। তখন কি তিনি জানতেন, এই বাচ্চাটাকেই একদিন বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবেন? জীবন তো এভাবেই চক্র আঁকে, আমাদের অজান্তে, ধীরে ধীরে, একটা বৃত্ত সম্পূর্ণও করে ফেলে।
শুধু এই একটা চক্র হলেও তো হতো! মেলাতে বসলে দেখবেন, পুরো ফাইনালটাই যেন পুরনো সুতোয় বোনা এক নতুন কাপড়। আর্জেন্টিনার টানা দুই ফাইনালে খেলার কুশীলব লিওনেল স্কালোনি একসময় স্পেনের লাস রোসাস একাডেমিতে কোচিং লাইসেন্স কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে, যিনি আজকের স্পেন কোচ।
শিক্ষক-ছাত্রের সেই সম্পর্ক পরে গভীর বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছিল। আজ তারা দুই বেঞ্চে বসে একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশল সাজাবেন। বলুন তো, বন্ধুত্ব আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এ দুটো কি সত্যিই আলাদা জিনিস? নাকি একই মুদ্রার দুই পিঠ?
আর ভেন্যুটা? সেটাও কি চক্রপূরণের কথাই বলছে না?
আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে, ২০১৬ সালে, এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। মেসি নিজেও একটা পেনাল্টি মিস করেছিলেন সেদিন। মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা বলে ফেলেছিলেন। কণ্ঠে হতাশা, চোখে ক্লান্তি। ম্যাচটা যেন একটা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। মেসিকে যেন বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই আকাশি-সাদা জার্সি তোমার জন্য নয় বাপু।
জাতীয় দলের দরজা অবশ্য কখনোই বন্ধ ছিল না মেসির জন্য। যা বন্ধ ছিল, সে সাফল্যের দরজা খুলে গিয়েছিল ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ, আবার কোপা আমেরিকা, মেসির জাতীয় দলের অর্জনের তালিকাটা এখন বেশ লম্বা। যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ২০১৮ বিশ্বকাপের ঠিক পর থেকেই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই আলবিসেলেস্তেদের ডেরাই মেসির সবচেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে আরামের জায়গা।
এবারের যাত্রাটা অবশ্য একটু আলাদা। এবার মেসি তরুণ নন। প্রতিটা ম্যাচের পর শরীরটা হয়তো একটু বেশিই ভারী লাগে, পেশিতে টান পড়ে একটু বেশিই। তবু তিনি খেলে গেছেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, একের পর এক কামব্যাকে দলকে টেনে তুলেছেন। বয়স তাকে থামাতে পারেনি, অন্তত এখন পর্যন্ত।
আপনি হয়তো জানেন, এই আকাশি-সাদা জার্সিটা মেসি চাইলে স্পেনের লালও হতে পারত। ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার স্বপ্নের বিশ্বকাপ ফাইনাল হলো আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। সেই কথার পর কেটে গেছে বিশ বছরেরও বেশি সময়। আর্জেন্টিনা খেলেছে আরও দুটো ফাইনাল, স্পেন একটা। কিন্তু বিশ্বকাপে দুই দলের দেখা হয়নি কখনো। হচ্ছে আজ, যখন মেসি দাঁড়িয়ে আছেন তার সম্ভাব্য শেষের দুয়ারে।
এই সাক্ষাৎটা আরও আগেও হতে পারত, গত মার্চেই, যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাধা না দিত। ২০২২ বিশ্বকাপে মেসির স্বপ্নপূরণের মঞ্চ লুসাইলে ২০২৬ সালে দুই দলের ফিনালিসিমায় মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বশান্তি, স্থিতি আর অগুণতি মানুষের প্রাণের মতো আরও অনেক মহামূল্য জিনিসের সঙ্গে সেই রোমাঞ্চে ভরা ম্যাচটাও বলি হয়ে গেল বিশ্বনেতাদের যুদ্ধ-নেশার। সেই দুই দল আজ আবার মুখোমুখি, এবার মেটলাইফে, মেসির দুঃস্বপ্নের সেই মঞ্চেই।
দুই দলের বহর মিলিয়ে বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ বোধহয় স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তার কথাতেও সময়ের সেই তাছির টের পাওয়া যায় হরহামেশাই। গত মাসে ইয়ামাল আর মেসিকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়তো অনেক বাচ্চাকেই কোলে নিয়েছে মেসি, হয়তো এটা কেবলই কাকতাল। কিন্তু আমরা যারা বিশ্বাসী, যারা দৃষ্টির বাইরে থাকা সত্তায় বিশ্বাস করি, তারা জানি, 'কাকতাল' হলো ঈশ্বরের ছদ্মনাম, যা তিনি ব্যবহার করেন যখন নিজের স্বাক্ষরটা করতে চান না।’
কথাটা কি শুধু মেসি আর ইয়ামালকে নিয়েই? নাকি আরও কিছু নিয়ে? দে লা ফুয়েন্তের সেই উক্তির দেড় মাস পর এত সব কাকতাল, এত সব চক্রপূরণের গল্প এসে মিলে গেল ঠিক একই বিন্দুতে, আজ রাতের এই মেটলাইফে। সেটাও কি কাকতাল নয়?
সবকিছুরই একটা শেষ আছে। ফাইনালের শেষ বাঁশি যখন বাজবে, চক্রপূরণ বলুন বা কাকতাল, সে তালিকাতেও কি যবনিকা পড়বে? না নতুন কোনো গল্পের গৌড়চন্দ্রিকা রচে দেবে, কে জানে!

