Logo
Logo
×
   

খেলা

যে দেশে গাছেরও ইতিহাস লেখা আছে

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

যে দেশে গাছেরও ইতিহাস লেখা আছে

গ্লাসগো বোটানিক গার্ডেনের পুরোনো বৃক্ষ

স্কটল‍্যান্ডের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। লেখা আছে গাছের গায়ে, বাকলের ভাঁজে, শেকড়ের গভীরে। এখানে শতবর্ষী একটি ওক গাছও একজন নীরব ইতিহাসবিদ। সে কথা বলে না, তবু শত বছরের গল্প শুনিয়ে যায়।

গ্লাসগো শহরে প্রথম যে জিনিসটি আমাকে বিস্মিত করেছিল, তা কোনো প্রাসাদ কিংবা জাদুঘরও নয়। বিস্মিত করেছিল কয়েকটি বিশাল বৃক্ষ। এত বড়, এত পুরোনো, এত যত্নে রক্ষিত গাছ যাদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই গাছ জন্মেছিল যখন, তখন হয়তো পৃথিবীর মানচিত্রও আজকের মতো ছিল না।

কেলভিনগ্রোভ পার্কে হাঁটতে হাঁটতে এমনই এক গাছের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গুঁড়ি এত মোটা যে চার পাঁচজন মানুষ হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালেও তাকে পুরো ঘিরে ফেলা যাবে না। শাখাগুলো আকাশের দিকে ছড়িয়ে আছে সময়ের বিস্তৃত হাত।

পাশে একটি ছোট্ট ফলক। সেখানে লেখা গাছটির বয়স, প্রজাতি, সংরক্ষণের ইতিহাস। এখানে ডড গাছেরও পরিচয় লেখা হয়। তাদের জন্মসাল আছে, ইতিহাস আছে, মর্যাদা আছে।

স্কটল্যান্ডে দুইশো-তিনশো বছরের পুরোনো গাছ কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। শহরের পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রাচীন এস্টেট কিংবা গ্রামের পথের ধারে এমন অসংখ্য বৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে যেগুলো জাতীয় ঐতিহ্যেরও অংশ।

একজন স্থানীয় প্রবীণ বলছিলেন, ‘আমরা এই গাছগুলোকে কাটি না, এগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেও পুরোনো। এরা আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী।’

বাংলাদেশে একটি গাছ কাটা হয় মিনিট কয়েকের মধ্যে। রাস্তা প্রশস্ত হবে, ভবন উঠবে, বাজার হবেএকটি করাতের শব্দেই শেষ হয়ে যায় বহু বছরের জীবন। তারপর নতুন একটি চারা লাগিয়ে আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিই। স্কটল্যান্ড সেই ভুলটি করে না।

এখানে কোনো পুরোনো গাছ অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলা হয় না। বিশেষজ্ঞরা আসেন। পরীক্ষা করেন। চিকিৎসা হয়। প্রয়োজন হলে চারপাশে বেড়া দেওয়া হয়। ডালপালা বেঁধে দেওয়া হয়। মানুষকে সতর্ক করা হয়। তাদের কাছে একটি পুরোনো গাছও সাংস্কৃতিক সম্পদ।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষী ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি, বিশাল বৃক্ষের শিকড় এড়িয়ে তৈরি হয়েছে পথ। পথের জন্য গাছ কাটেনি মানুষ, উল্টো গাছের জন্য পথ ঘুরে গেছে।

সভ্যতা শুধু আকাশছোঁয়া অট্টালিকা নয়। সভ্যতা হলো, দুর্বলকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা। যে গাছ নিজের কথা বলতে পারে না, তাকেও বাঁচিয়ে রাখার দায়। কেলভিনগ্রোভ পার্ক, গ্লাসগো গ্রিন, বোটানিক গার্ডেনে শতবর্ষী বৃক্ষের পাশে মানুষ বসে বই পড়ছে, শিশুরা খেলছে, বৃদ্ধরা হাঁটছেন। গাছগুলো যেন পরিবারের প্রবীণ সদস্য। সবাই জানে, তারা আছে বলেই এই জায়গাগুলোর আত্মা বেঁচে আছে।

একদিন বৃষ্টির পর এক বৃদ্ধাকে দেখেছিলাম একটি বিশাল ওক গাছের কাণ্ডে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে। কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকতেই তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে একে চিনি। হয়তো আমার নাতিরাও একদিন একে দেখবে।’

একটি গাছের সঙ্গে তিন প্রজন্মের সম্পর্ক।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম