Logo
Logo
×
   

খেলা

যে পাহাড় মানুষকে ভাবতে শেখায়

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ এএম

যে পাহাড় মানুষকে ভাবতে শেখায়

গ্লেনকো-স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত উপত্যকা ও পাহাড়ি অঞ্চল। নাটকীয় পাহাড়, কুয়াশা আর ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত।

কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়। দূরে ছুটে চলা বাতাস। নির্জন উপত্যকার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট ঘর। চারপাশে শুধু প্রকৃতির নীরবতা। স্কটল্যান্ডের পাহাড়, হ্রদ আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর শুধু চোখকে শান্ত করে না, মনকেও ভাবতে শেখায়। এই দেশের প্রকৃতি বহু শতাব্দী ধরে লেখক, কবি, দার্শনিক ও শিল্পীদের অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছে। এখানে পাহাড় একটি চিন্তার জায়গা। মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলতে শেখে।

স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস অঞ্চলে গেলে প্রথম যে অনুভূতি হয়, তা হলো বিশালতার। চারপাশে পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, নীল হ্রদ আর আকাশের অসীম বিস্তার। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এই জায়গাগুলো মানুষকে ধীর করে দেয়।

গ্লাসগো বা এডিনবরার ব্যস্ত রাস্তায় সময় ছুটে চলে, সেখানে পাহাড়ের পথে হাঁটলে মনে হয় সময় একটু থেমে গেছে। একজন স্থানীয় ভ্রমণপ্রেমী ম্যাকলিওড বলছিলেন, এখানে এসে মানুষ নিজের ভেতরের শব্দ শুনতে পায়। শহরে যে প্রশ্নগুলো হারিয়ে যায়, পাহাড়ে এসে সেগুলো আবার ফিরে আসে।

স্কটল্যান্ডের সাহিত্য ইতিহাসও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। বিশ্বখ্যাত কবি রবার্ট বার্নস তার লেখায় তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের জীবন, ভালোবাসা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য। স্কটিশ লেখক স্যার ওয়াল্টার স্কট তার উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন এই দেশের পাহাড়, দুর্গ আর ইতিহাসকে। লেখকদের কাছে স্কটল্যান্ডের প্রকৃতি ছিল শুধু পটভূমি নয়, ছিল একটি জীবন্ত চরিত্র। পাহাড়ের নীরবতা, হ্রদের গভীরতা, বাতাসের শব্দ তাদের লেখার ভাষা হয়ে উঠেছিল।

স্কটল্যান্ড শুধু কবি-সাহিত্যিকের দেশ নয়, এটি দার্শনিকদেরও দেশ। ১৮ শতকের স্কটিশ এনলাইটেনমেন্ট বা বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বিশ্ব দর্শন ও জ্ঞানচর্চায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। ডেভিড হিউম, অ্যাডাম স্মিথের মতো দার্শনিকরা এখান থেকেই উঠে এসেছিলেন। মানুষ, সমাজ, অর্থনীতি ও নৈতিকতা নিয়ে তাদের ভাবনা আজও বিশ্বজুড়ে আলোচিত। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, স্কটল্যান্ডের পরিবেশ,প্রকৃতির বিশালতা, স্বাধীন চিন্তার আবহ এবং শিক্ষার ঐতিহ্য এর বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল।

মোবাইল, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মানুষকে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু স্কটল্যান্ডের কিছু জায়গায় গেলে সেই ব্যস্ততা হঠাৎ থেমে যায়। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, একা হাঁটা, হ্রদের পাশে বসে থাকার মুহূর্ত মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

শাহনাজ, স্কটল্যান্ডে বেড়াতে এসে বলছিলেন, ‘এখানে নীরবতাও যেন কথা বলে। মনে হয় প্রকৃতি কিছু বলতে চাইছে।’ এই অনুভূতিই হয়ত স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

স্কটিশ মানুষের জীবনেও প্রকৃতির প্রভাব গভীর। কৃষক, জেলে, পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবন সরাসরি নির্ভর করে প্রকৃতির ওপর। তাদের কাছে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্য নয়, জীবনযাত্রার অংশ। শীতের কঠিন আবহাওয়া, ঝোড়ো বাতাস, দীর্ঘ রাতের সঙ্গে লড়াই করেই গড়ে উঠেছে এখানকার মানুষের মানসিক দৃঢ়তা। হয়ত এ কারণেই স্কটিশ সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা, সাহস আর আত্মপরিচয়ের বিষয়গুলো এত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আসে স্কটল্যান্ড দেখতে। কেউ আসে এডিনবরার দুর্গ দেখতে, কেউ লোখ নেসের রহস্য খুঁজতে, কেউ হাইল্যান্ডসের সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে। অনেক পর্যটক ফিরে যান অন্য এক অভিজ্ঞতা নিয়ে। তারা শুধু ছবি নিয়ে ফেরেন না, সঙ্গে নিয়ে যান কিছু ভাবনা।

প্রকৃতির সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর শিক্ষা। স্কটল্যান্ডের পাহাড়ের সৌন্দর্য তার উচ্চতায় নয়, তার অনুভূতিতে। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবী কত বড় আর মানুষ কত ছোট। একই সঙ্গে বুঝতে পারে, ছোট জীবনও কত গভীর হতে পারে।

গ্লাসগোর ব্যস্ত শহর থেকে হাইল্যান্ডসের নির্জন পথে গেলে হয়ত কেউ নিজের জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান। কেউ খুঁজে পান লেখার বিষয়। কেউ খুঁজে পান শান্তি।

কেউ শুধু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছু জায়গা আছে, যেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু দেখা নয় অনুভব করা। স্কটল্যান্ডের পাহাড় তেমনই এক জায়গা। যেখানে বাতাস শুধু বয়ে যায় না, মানুষের চিন্তার দরজাও খুলে দেয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .