Logo
Logo
×
   

খেলা

স্কটল্যান্ডের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

স্কটল্যান্ডের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ

স্কটল্যান্ডের বৃষ্টি কখনও ঝমঝম করে নামে না। নীরবে নামে। ঠিক যেমন নীরবে প্রবাসী মানুষের ভেতরে জমে থাকে একটি দেশের নাম। গ্লাসগোর বালগৃহিল কমিউনিটি সেন্টারের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মনে হয়, সেই নীরবতার ভেতর কেউ হঠাৎ বাংলায় বলে উঠল, ‘আসেন, বসেন।’ কয়েক হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ যেন মুহূর্তেই হাতের নাগালে চলে আসে।

এক কক্ষে ছোট ছোট শিশু বাংলা বর্ণমালা শিখছে। পাশের হলে ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেটের শব্দ। কোথাও বৈশাখী উৎসবের মহড়া, কোথাও এক কাপ চায়ের সঙ্গে আড্ডা। দেয়ালে শহীদ মিনার, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, লাল-সবুজের পতাকা। মনে হয়, গ্লাসগোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নয়, বাংলাদেশেরই কোনো পরিচিত মহল্লায় এসে পড়েছি।

এটাই গ্লাসগো বাংলা সেন্টার। শুধু একটি সামাজিক সংগঠন নয়, স্কটল্যান্ডে বসবাসরত হাজারো বাংলাদেশির স্মৃতি, পরিচয় আর ভালোবাসার ঠিকানা।

১৯৮৫ সালে কয়েকজন স্বপ্নবাজ মানুষের হাতে শুরু হয়েছিল পথচলা। চার দশকেরও বেশি সময় পর সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ভাষা শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি, খেলাধুলা থেকে সমাজসেবা, নতুন প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানো থেকে বাংলাদেশের দুর্যোগে মানবিক সহায়তার সবকিছুর কেন্দ্র এই বাংলা সেন্টার।

সভাপতি মলয় সরকার বলছিলেন, শুরুতে ছিল কেবল একটি স্বপ্ন। প্রবাসে থেকেও যেন বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আজ সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক বালগৃহিল কমিউনিটি সেন্টার। গ্লাসগো সিটি কাউন্সিল এই ভবনের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বাংলা সেন্টারের হাতে। এটি শুধু একটি কমিউনিটি হল নয়, স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির সততা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি।

প্রতিদিন এই ভবনে বসে ছোট্ট এক বাংলাদেশ। প্রবীণদের আড্ডা, শিশুদের বাংলা ক্লাস, তরুণদের ক্রীড়া আয়োজন, নারীদের সাংস্কৃতিক অনুশীলন, কমিউনিটির সভায় সারাদিন যেন মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে জায়গাটি। অনেকের কাছেই এটি দ্বিতীয় বাড়ি।

বাংলা সেন্টারের সবচেয়ে বড় গর্ব বাংলা স্কুল। ট্রাস্টি সভাপতি ড. জসিম আহমেদের ভাষায়, এটাই সংগঠনের প্রাণ। এখান থেকে ইতিমধ্যে ৪২ জন শিক্ষার্থী বাংলা ভাষায় জিসিএসই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে গ্লাসগোর গ্যালিক স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে বাংলা সেন্টার। টানা ২৬ বছরের এই উদ্যোগ মাতৃভাষার মর্যাদা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

এই কেন্দ্রের দরজা শুধু বাংলাদেশিদের জন্য খোলা নয়। ট্রাস্টি সদস্য গিয়াস উদ্দিন ও বালগৃহিল প্রপার্টি ম্যানেজার সাইফুল আলম নাহিদ জানান, স্কটিশ, ইংলিশ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইউক্রেনীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষও নিয়মিত এই হল ব্যবহার করেন। ফলে এটি আজ গ্লাসগোর বহুসাংস্কৃতিক সমাজেরও একটি পরিচিত মিলনকেন্দ্র।

এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এর স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব। ট্রাস্টি সদস্য আমিনুল ইসলাম টিটু জানালেন, এখানে কেউ পারিশ্রমিক নেন না। প্রতি বছরের হিসাব-নিকাশ ও অডিট সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়। সবাই কাজ করেন একটি বিশ্বাস থেকে। কমিউনিটির জন্য কিছু করার আনন্দই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও কখনও শিথিল হয়নি। সহসভাপতি শাহিনুর হোসেন স্মরণ করিয়ে দিলেন সাম্প্রতিক বন্যা, চট্টগ্রামের অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার কথা। প্রতিবারই গ্লাসগো বাংলা সেন্টার প্রবাসীদের সহায়তা নিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ক্রীড়াঙ্গনেও রয়েছে সংগঠনটির উজ্জ্বল উপস্থিতি। ট্রাস্টি সদস্য আশরাফ চৌধুরী ও স্পোর্টস সেক্রেটারি সিফাত রাব্বি বাপ্পি বললেন, স্কটিশ বাংলা লীগ এখন কমিউনিটির অন্যতম পরিচিত আয়োজন। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি ও কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত রাখা হচ্ছে।

শুধু উৎসব নয়, সংকটেও এই সংগঠন প্রথম আশ্রয়। কমিউনিটি সেক্রেটারি আকরাম হোসেন, আইটি সেক্রেটারি ড. আসিফ খান এবং ট্রাস্টি ড. সাইফ আহমেদ জানালেন, বাংলাদেশ থেকে নতুন কেউ গ্লাসগোতে এলে অনেক সময় বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় বাংলা সেন্টারের দায়িত্ব। থাকার ব্যবস্থা, বাসা খুঁজে দেওয়া, চাকরির তথ্য, আইনি পরামর্শ, এমনকি প্রয়োজন হলে খাবারের ব্যবস্থাও করে দেন সদস্যরা। কেউ ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শ দেন, কেউ পরিবারের সদস্যের মতো পাশে দাঁড়ান।

বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকে বাংলা সেন্টার। পয়লা বৈশাখ, বাংলা মেলা, মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ডস, শিশুদের নাচ-গান, খেলাধুলা—সব মিলিয়ে যেন একটানা উৎসব। সাংস্কৃতিক সম্পাদক সেলিম রেজা জানান, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও এখন নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ব্যাডমিন্টন আয়োজনেও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন সোহাগ মিয়া।

সভাপতি মলয় সরকারের কথায় উঠে এল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। প্রতিবছর দুই থেকে তিনবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার সেবা গ্লাসগোতে নিয়ে আসা হয়। ফলে একটি পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা অন্য কনস্যুলার সেবার জন্য আর মানুষকে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ম্যানচেস্টারে যেতে হয় না। প্রয়োজনীয় সেবা মিলছে নিজের কমিউনিটি সেন্টারেই।

সাধারণ সম্পাদক পিয়াস সাব্বির খান জানান, ট্রাস্টি বোর্ডের পাশাপাশি ২৩ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি বছরজুড়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজসেবা ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করে। আর ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য আফজাল ফকির লেলিন, শাহিন খান ও সিনিয়র সদস্য মাহমুদুল হাসান বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য আগামী প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে জীবন্ত রাখা।

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি নামছে। স্কটল্যান্ডের আকাশ ধূসর। কিন্তু বালগৃহিল কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে শিশুদের কণ্ঠে ভেসে আসছে—‘অ আ ক খ’।

প্রবাসে মানুষ সবচেয়ে বেশি খোঁজে নিজের ভাষা, নিজের মানুষ আর নিজের পরিচয়। গ্লাসগো বাংলা সেন্টার সেই তিনটিকেই এক ছাদের নিচে ধরে রেখেছে।

তাই এই ভবন শুধু ইট-কাঠ-সিমেন্টের নয়। এটি হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দেশের স্পন্দন। স্কটল্যান্ডের বুকে, সত্যিই এক টুকরো বাংলাদেশ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .