Logo
Logo
×
   

খেলা

বৃদ্ধ মানে বোঝা নয়, তারা জীবন্ত ইতিহাস

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩১ পিএম

বৃদ্ধ মানে বোঝা নয়, তারা জীবন্ত ইতিহাস

গ্লাসগোর ঐতিহাসিক বৃদ্ধাশ্রম।

একটি জানালা। পাশে রাখা একটি আরামকেদারা। টেবিলের ওপর চশমা, কয়েকটি পুরোনো ছবি আর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। বাইরে হয়তো বৃষ্টি পড়ছে। শহর ছুটছে নিজের গতিতে। কিন্তু ঘরের ভেতরে একজন মানুষ থেমে আছেন স্মৃতির পাতায়।

তিনি অপেক্ষা করছেন কারও জন্য। হয়তো সন্তানের একটি ফোনের জন্য, হয়তো পরিচিত কোনো কণ্ঠের জন্য, শুধু একটু গল্প করার জন্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় অনেক সময় অসুস্থতা নয়, একাকিত্ব। শরীরের শক্তি কমে যায়, হাঁটার গতি ধীর হয়, চোখের দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু মনের ভেতরের ভালোবাসার প্রয়োজন কখনো কমে না। বরং শেষ বয়সে এসে মানুষ আরও বেশি করে চান কেউ তাকে মনে রাখুক, কেউ তার কথা শুনুক, কেউ তাকে প্রয়োজনীয় মনে করুক।

স্কটল্যান্ডের শহরগুলোতে কেয়ার হোম অনেক প্রবীণ মানুষের জীবনের নতুন এক ঠিকানা। সেখানে প্রবীণদের শুধু যত্ন নেওয়া হয় না, তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়টুকুও সম্মানের সঙ্গে সাজানোর চেষ্টা করা হয়।

গ্লাসগোর একটি কেয়ার হোমে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়েছে এক অন্যরকম পরিবেশ। কোথাও কেউ বই পড়ছেন, কেউ সংগীত শুনছেন, কেউ পুরোনো দিনের গল্প করছেন। কেউ ছবি আঁকছেন, কেউ নতুন বন্ধুদের সঙ্গে হাসছেন। বয়স তাঁদের থামিয়ে দেয়নি। বরং নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ তৈরি করেছে।

৭৮ বছর বয়সি মেরি ম্যাকডোনাল্ড জানালার পাশে বসে বলছিলেন, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সবচেয়ে বেশি যেটা হারায়, সেটা হলো কথা বলার মানুষ। এখানে এসে আমি আবার বন্ধু পেয়েছি। এখানে কেউ আমাকে শুধু একজন বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে দেখে না, একজন মানুষ হিসেবেই দেখে।’

মেরির হাতে ছিল একটি পুরোনো ছবি। ছবিতে তার পরিবারের সদস্যরা। ছবির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘পরিবার আমার কাছে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। সবাই সব সময় পাশে থাকতে পারে না। তাই এমন একটি জায়গা দরকার, যেখানে বয়স হলেও মানুষ নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে।’

আরেক প্রবীণ বাসিন্দা জন অ্যান্ডারসনের কথাতেও ফুটে উঠল একই অনুভূতি। তিনি বলেন, ‘কেয়ার হোম মানে একাকিত্ব নয়। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। আমরা একসঙ্গে গল্প করি, গান শুনি, হাসি। জীবন এখানে থেমে নেই।’

স্কটল্যান্ডের প্রবীণ সেবা ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক পরিকল্পনা। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কমিউনিটি সাপোর্ট মিলিয়ে প্রবীণদের জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি সহায়ক পরিবেশ। পরিবারের ভালোবাসা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রও সেখানে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করেছে।

বৃদ্ধ মানুষ কোনো বোঝা নন। তারা একটি সমাজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও ইতিহাসের ধারক। বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন।

এই দেশের সংস্কৃতিতে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা গভীর। পরিবারের সবচেয়ে বড় আশ্রয় অনেক সময় তাঁরাই। তাঁদের ত্যাগ, ভালোবাসা আর পরিশ্রমে গড়ে ওঠে একটি পরিবার। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন অসংখ্য বাবা-মা।

সময় বদলেছে। বদলেছে জীবনযাত্রা। শহরমুখী ব্যস্ততা, ছোট পরিবার, কর্মজীবনের চাপ, সন্তানদের বিদেশে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে অনেক প্রবীণ মানুষ ধীরে ধীরে একাকিত্বের মুখোমুখি হচ্ছেন। কোথাও তাঁরা পরিবারের মধ্যেও নিঃসঙ্গ, কোথাও আবার শেষ বয়সে খুঁজছেন একটু নিরাপদ আশ্রয়।  

বাংলাদেশে প্রবীণদের নিয়ে ভাবনার জায়গাটিও তাই নতুন করে দেখতে হবে। কোথাও কোথাও বৃদ্ধসেবার নামে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে অর্থের হিসাব বড় হয়ে ওঠে। আবার অন্যদিকে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা ভালোবাসা ও মানবিকতার জায়গা থেকে প্রবীণদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

একজন বৃদ্ধ মানুষের প্রয়োজন শুধু একটি বিছানা, খাবার কিংবা ওষুধ নয়। প্রয়োজন সম্মান, ভালোবাসা এবং মানসিক নিরাপত্তা।

বৃদ্ধদের সেবা কোনো ব্যবসা নয়, এটা মানবতার পরীক্ষা। বয়স বাড়লে মানুষ অনেক কিছু হারান। কর্মক্ষমতা কমে, পরিচিতির পরিধি ছোট হয়, অনেক কাছের মানুষ চলে যান। তার অনুভূতি, ভালোবাসা ও সম্মানের প্রয়োজন কখনো কমে না।

বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য প্রয়োজন আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ। শুধু বয়স্ক ভাতা নয়, প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা সহায়তা, বিনোদনের সুযোগ এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার ব্যবস্থা। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শুধু চিকিৎসা চান না, চান একজন শ্রোতা। শুধু খাবার চান না, চান একটি পরিচিত মুখ।

গ্লাসগোর সেই কেয়ার হোমে একটি দৃশ্য বারবার মনে পড়ে। এক বৃদ্ধা টেবিলে বসে পুরোনো অ্যালবাম দেখছিলেন। পাশে বসে এক তরুণ সেবাকর্মী মন দিয়ে শুনছিলেন তার জীবনের গল্প। পৃথিবীর কাছে হয়তো সেটি ছিল খুব সাধারণ একটি মুহূর্ত। কিন্তু ওই বৃদ্ধার কাছে সেটিই ছিল দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। মানবতা আসলে এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই বেঁচে থাকে।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নুসরাত বলেন, ‘এখানে এসে বুঝেছি, প্রবীণদের যত্ন শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, সমাজেরও দায়িত্ব। বাংলাদেশে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা আছে, কিন্তু প্রবীণদের জন্য পরিকল্পিত সেবা ও নিরাপদ পরিবেশ আরও বাড়ানো দরকার।’

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের নিয়ে ভাবা মানে নিজের ভবিষ্যতের জন্যও একটি মানবিক সমাজ তৈরি করা। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা উন্নয়ন দিয়ে হয় না। পরিচয় হয় সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের কতটা সম্মান ও যত্ন দেয়, তার ওপর।

বৃদ্ধ মানুষ কোনো বোঝা নন। তারা আমাদের শিকড়। তাদের হাত ধরেই আমরা আজকের জায়গায় পৌঁছেছি। শেষ বয়সে তাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে তারা অনুভব করবেন, ‘আমি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। আমার জীবন এখনো মূল্যবান।’

জীবনের শেষ অধ্যায়টিও সুন্দর হওয়ার অধিকার রাখে। সেই সৌন্দর্য তৈরি হয় ভালোবাসা, সম্মান আর মানবতার আলোয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .