Logo
Logo
×
   

খেলা

আবাহনী-মোহামেডান এর ভালোবাসা নিয়েই লন্ডনে ওয়াহেদের জীবন

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

আবাহনী-মোহামেডান এর ভালোবাসা নিয়েই লন্ডনে ওয়াহেদের জীবন

ফুটবলের মাঠে আবাহনী-মোহামেডান মানেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ। একদিকে আকাশি-হলুদ, অন্যদিকে সাদা-কালো শিবিরের দুই দলের সমর্থকদের আবেগ দুই ভিন্ন স্রোত। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও কখনো কখনো জন্ম নেয় ভালোবাসার এক অন্য গল্প। সেই গল্পের নাম ওয়াহেদ আহমেদ।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই তারকা খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের শুরুতেই জায়গা করে নিয়েছিলেন দেশের দুই বড় ক্লাব মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও ঢাকা আবাহনী লিমিটেডে। ঢাকার মাঠে তার নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকরা। সাদাকালো জার্সিতে জিতেছেন ‘কোটি টাকার’ টুর্নামেন্ট হিসেবে পরিচিত সুপার কাপ। জাতীয় দলের হয়েও প্রতিনিধিত্ব করেছেন গর্বের সঙ্গে।

ফুটবলের সেই ব্যস্ত অধ্যায় থেমে যায় ২০১৭ সালে। দেশের ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে চলে আসেন লন্ডনে। এখন তার ঠিকানা ইস্ট লন্ডন। ব্যবসা ও চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও ফুটবলকে ছাড়তে পারেননি। দেশের ফুটবল থেকে দূরে থাকলেও ফুটবলই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। লন্ডনেই গড়ে উঠেছে তার নতুন সংসার। সাত বছর বয়সি মেয়ে আরিয়া আহমেদ এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার ফুটবলের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হচ্ছে আরিয়া। ওয়াহেদের ইচ্ছা, মেয়েও খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বড় হয়ে উঠুক।

৩৫ বছর বয়সি ওয়াহেদ এখন লন্ডন এফসির নিয়মিত খেলোয়াড়। ক্লাবটি অনেকটা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর মতো, বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বয়সে অভিজ্ঞ। তারা ক্যানারি ওয়ার্ফ লিগে খেলেন। পাশাপাশি লন্ডনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও (বিপিএল) অংশ নেন ওয়াহেদ। এই লিগে ১৩টি দল অংশ নেয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি দলে খেলতে পারেন সাতজন স্থানীয় ও চারজন বিদেশি খেলোয়াড়। গ্রীষ্মকালেই হয় এই লিগ। সপ্তাহে একদিন, রোববার অনুষ্ঠিত হয় ম্যাচ। ১২টি ম্যাচের এই প্রতিযোগিতার প্রতিটি খেলা হয় ৭০ মিনিটের।

লন্ডন টাওয়ার ব্রিজের সামনে বসে ওয়াহেদ বলছিলেন, ‘প্রায় নয় বছর হয়ে গেছে এখানে আসা। এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশ সবকিছুই ভালো লাগে। এখন আমি এখানে ভালো আছি।’

তবে ভালো থাকার মাঝেও বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য মন কাঁদে তার। ওয়াহেদের ভাষায়, ‘সত্যি বলতে বাংলাদেশের ফুটবলকে খুব মিস করি। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। পরিবারেরও ইচ্ছে ছিল আমাকে ফুটবলার বানানোর। আমার স্বপ্ন ছিল আবাহনী ও মোহামেডান দুই দলে খেলব। আল্লাহ সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। জাতীয় দলেও খেলেছি।’

কেন লন্ডনে চলে আসা? জবাবে কিছুটা আবেগী হয়ে ওয়াহেদ বলেন, ‘হয়ত স্বপ্নটা আরও দীর্ঘায়িত করার কথা ছিল, কিন্তু নানা কারণে পারিনি। অনেকটা অভিমান করেই লন্ডনে চলে এসেছি। সেই অভিমানটা নিজের মধ্যেই রাখতে চাই। আমি চাই সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক থাকুক।’

লন্ডনে এসেও ফুটবলকে ছাড়েননি তিনি। খেলছেন স্থানীয় লিগে, যুক্ত আছেন লন্ডন এফসির সঙ্গে। খুব শিগগিরই লন্ডনের একটি স্কুলে ফুটবল কোচ হিসেবেও কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। নিজের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান। বাংলাদেশের ফুটবলের খবরও নিয়মিত রাখেন। দেশের ফুটবলের উন্নতি নিয়ে তার ভাবনাও আছে। তার মতে, পাইপলাইনে খেলোয়াড় তৈরির কাজ আরও বাড়াতে হবে। প্রতিটি ক্লাবের বয়সভিত্তিক দল থাকলে নতুন ফুটবলার উঠে আসবে।

আবাহনী-মোহামেডানের প্রসঙ্গ উঠতেই অন্য এক ওয়াহেদকে দেখা যায়। আবেগ জড়িয়ে যায় কণ্ঠে। বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের শুরুটা মোহামেডানে। সেই দলটির প্রতি আমার অন্যরকম মায়া আছে। আবার মোহামেডানে খেললেও আবাহনীর সমর্থক ছিলাম। দুটো টিমই আমার অন্তরে আছে। যখন দুটি দল ভালো করে, তখন খুব ভালো লাগে। আর খারাপ করলে কষ্ট পাই।’

লন্ডনের ব্যস্ত জীবনে থেকেও তাই ঢাকার মাঠের স্মৃতি তাকে টানে। টানে গ্যালারির চিৎকার, বড় ম্যাচের উত্তেজনা, সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনের ঠিকানা। বদলায়নি ভালোবাসা।

ওয়াহেদের কাছে আবাহনী ও মোহামেডান এখন আর শুধু দুটি ক্লাব নয় দুটি আবেগ, দুটি স্মৃতি, হৃদয়ের দুই অধ্যায়। মাঠে যেখানে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জীবনের পাতায় সেখানে রয়ে গেছে ভালোবাসার গল্প। এখন সেই গল্পের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি অধ্যায়।প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে ফুটবল শেখানোর স্বপ্ন। হয়ত একদিন কোনো ছোট্ট ফুটবলারের সাফল্যের ভেতরেই তিনি খুঁজে পাবেন নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের নতুন ঠিকানা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .