Logo
Logo
×
   

খেলা

গ্লাসগোর সবুজ স্বপ্নের ভেতর এক বিকেল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম

গ্লাসগোর সবুজ স্বপ্নের ভেতর এক বিকেল

শহরের কোলাহল থেকে কয়েক মিনিট দূরে গেলেই যেন অন্য এক পৃথিবী। যেখানে নেই ট্রাফিকের শব্দ, নেই ব্যস্ত মানুষের তাড়া। আছে শুধু পাতার মর্মর, পাখির ডাক আর কাচের ঘরের ভেতর শত বছরের পুরোনো গাছের নিঃশ্বাস।

গ্লাসগো বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢুকলে প্রথম অনুভূতিটাই এমন, শহরটা যেন হঠাৎ করে একটু ধীরে হাঁটতে শুরু করেছে।

কমনওয়েলথ গেমসের উত্তেজনায় কয়েক দিন ধরে যে গ্লাসগো ছুটছিল, সেই শহরের অন্য এক মুখ দেখা যায় এখানে। স্টেডিয়ামের গর্জন নেই, পতাকার রং নেই, অ্যাথলেটদের দৌড় নেই। আছে প্রকৃতির এক নীরব আয়োজন। যেখানে সময়ের গতি একটু থেমে যায়।

সেই সবুজ বিকেলের সঙ্গী ছিলেন আশরাফ চৌধুরী। নোয়াখালীর ছেলে। একসময় পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন এই গ্লাসগোয়। তারপর সময়ের সঙ্গে লড়াই করে, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

ক্লাইড নদীর শহর গ্লাসগোর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই বোটানিক্যাল গার্ডেন শহরের স্মৃতির একটি জীবন্ত অধ্যায়। ১৮১৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যান আজও ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য। প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই সবুজ রাজ্য প্রতি বছর হাজারো মানুষকে টেনে আনে।

প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে বিশাল সবুজ চত্বর। দুই পাশে সারি সারি গাছ। কোথাও ফুলের বাগান, কোথাও ছায়াঘেরা পথ। মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই এখানে নিজের হাতে ছবি এঁকেছে।

এই বাগানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কিবল প্যালেস। কাচের তৈরি বিশাল গম্বুজ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ভিক্টোরিয়ান যুগের কোনো রাজপ্রাসাদ। ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি আসলে পৃথিবীর নানা প্রান্তের উদ্ভিদের এক আশ্চর্য মিলনমেলা।

১৮৭৩ সালে নির্মিত এই কাচঘরটি সময়ের সঙ্গে লড়াই করে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। লোহার কাঠামো আর কাচের দেয়ালের ভেতরে পৃথিবীর বিভিন্ন জলবায়ুর গাছেরা নিজেদের গল্প বলে চলেছে।

কোথাও উষ্ণ দেশের তালগাছ, কোথাও অদ্ভুত আকৃতির ক্যাকটাস, কোথাও রঙিন ফুল। স্কটল্যান্ডের ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝেও এখানে তৈরি করা হয়েছে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ, যাতে দূর দেশের উদ্ভিদগুলো বেঁচে থাকতে পারে।

এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাতার গাছ দেখে মনে হয়, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো জঙ্গলে চলে এসেছি। আবার অন্য পাশে ছোট ছোট অর্কিডের সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সবচেয়ে ছোট সৃষ্টিও কতটা নিখুঁত হতে পারে।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের সৌন্দর্য শুধু গাছপালায় নয়, তার পরিবেশেও।

একটি বেঞ্চে বসে দেখা যায়, কেউ বই পড়ছেন। কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। কেউ ছবি তুলছেন। কেউ আবার চুপচাপ বসে আছেন। এই ‘চুপ করে থাকা’রও আলাদা একটা ভাষা আছে।

ব্যস্ত শহরের মানুষ এখানে এসে কিছু সময়ের জন্য নিজের সঙ্গে কথা বলেন।

এক বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখা গেল ধীরে ধীরে হাঁটছেন। হাতে হাত রাখা। বহু বছর ধরে এই পথেই হাঁটছেন তাঁরা। এই বাগান তাদের জীবনের অনেক গল্পের সাক্ষী।

এক তরুণী মাটিতে বসে ছবি আঁকছিলেন। সামনে গাছ, পেছনে কিবল প্যালেস। তার ক্যানভাসে ধরা পড়ছিল একটি অনুভূতি।

গ্লাসগোর মানুষ প্রকৃতিকে যে কতটা ভালোবাসেন, এই জায়গায় না এলে বোঝা কঠিন। এখানে প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্কটা খুব সহজ। কোনো কৃত্রিমতা নেই। কেউ গাছকে শুধু দেখার বস্তু মনে করেন না। বরং মনে হয়, এই সবুজই শহরের মানুষের পুরোনো বন্ধু।

এখানে বাংলাদেশের কথাও মনে পড়ে।

সবুজে ঘেরা গ্রাম, নদীর পাড়, বর্ষায় ভেজা মাটি দূর প্রবাসে থাকা মানুষের কাছে এমন জায়গা কখনও কখনও শৈশবের দরজা খুলে দেয়। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়, দেশের কোনো পুরোনো বিকেলে ফিরে গেছি।

বিকেল গড়িয়ে যখন আলো একটু নরম হয়ে আসে, কিবল প্যালেসের কাচে সূর্যের শেষ রং পড়ে। গাছের ছায়া লম্বা হয়। পাখির ডাক বাড়ে। দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে। তখন এই বাগানকে আরও বেশি নিজের মনে হয়।

সারাদিনের ব্যস্ততার শেষে প্রকৃতি বলছে আরও একটু থাকো।

গ্লাসগোকে অনেকে চেনেন ফুটবল, সংগীত, শিল্প আর কমনওয়েলথ গেমসের শহর হিসেবে। কিন্তু এই শহরের আরেকটি পরিচয় আছে। এটি এমন একটি শহর, যেখানে কংক্রিটের মাঝেও সবুজ স্বপ্ন বেঁচে থাকে।

গ্লাসগো বোটানিক্যাল গার্ডেন সেই স্বপ্নেরই নাম। শহর বদলায়। মানুষ বদলায়। সময় চলে যায়। কিছু জায়গা থেকে যায় একই রকম। যেখানে গেলে মনে হয়, পৃথিবী এখনও সুন্দর।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .