আইফোন কেন এত জনপ্রিয়? এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো কী
আইটি ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০০৭ সালের ৯ জানুয়ারি—প্রযুক্তি বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন এমন এক ডিভাইসের, যা চিরতরে বদলে দেয় মোবাইল ফোনের সংজ্ঞা। ফিজিক্যাল কিবোর্ড বাদ দিয়ে পুরো স্ক্রিনজুড়ে টাচ ইন্টারফেস, ইন্টারনেট ব্রাউজিং এবং আইপডের দারুণ এক সমন্বয় নিয়ে হাজির হয় প্রথম ‘আইফোন’। সেই থেকে শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অ্যাপলকে।
স্মার্টফোনের দুনিয়ায় অ্যাপলের ‘আইফোন’ বরাবরই এক আভিজাত্য ও বিশ্বস্ততার নাম। প্রতি বছর নতুন মডেল বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের মধ্যে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা সত্যিই বিরল। দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও কেন এই ডিভাইসটির এত চাহিদা?
কেন দিন দিন আইফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে?
বাজারে শত শত অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন থাকলেও আইফোন তার নিজস্ব অবস্থান ধরে রেখেছে এবং এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
১. দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার সাপোর্ট: একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন সাধারণত ২-৩ বছর সফটওয়্যার আপডেট পায়। কিন্তু অ্যাপল তাদের আইফোনগুলোতে ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত নিয়মিত আইওএস (iOS) ও সিকিউরিটি আপডেট দেয়। ফলে পুরনো মডেলের আইফোনও বছরের পর বছর নতুনের মতো মসৃণ পারফরম্যান্স দেয়।
২. দুর্দান্ত ইকোসিস্টেম: অ্যাপলের সবচেয়ে বড় জাদুর জায়গা হলো এর ইকোসিস্টেম। আইফোন, ম্যাকবুক, আইপ্যাড এবং অ্যাপল ওয়াচের মধ্যে যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ (যেমন: এয়ারড্রপ, কন্টিনিউটি) কাজ করে, তা ব্যবহারকারীর কাজকে দারুণ সহজ করে দেয়।
৩. সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি: অ্যাপল সবসময়ই গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। এর ক্লোজড-সোর্স অপারেটিং সিস্টেমের কারণে আইফোনে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস আক্রমণের ঝুঁকি অ্যান্ড্রয়েডের তুলনায় অনেক কম।
৪. সেরা ক্যামেরা পারফরম্যান্স: স্থিরচিত্রের পাশাপাশি ভিডিওগ্রাফির ক্ষেত্রে আইফোন এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভ্লগারদের কাছে এর কালার ব্যালেন্স, স্ট্যাবিলাইজেশন এবং সিনেমাটিক মোড ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
৫. উচ্চ রিসেল ভ্যালু (Resale Value): অন্যান্য স্মার্টফোনের তুলনায় আইফোনের দাম বাজারে সহজে কমে না। ফলে ব্যবহারের কয়েক বছর পর বিক্রি করতে গেলেও বেশ ভালো দাম পাওয়া যায়, যা ক্রেতাদের আইফোন কিনতে আরও বেশি উৎসাহিত করে।
৬. শক্তিশালী প্রসেসর: অ্যাপলের নিজস্ব বায়োনিক চিপ (Bionic Chip) যেকোনো হেভি গেমিং বা মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে বাজারের অন্যান্য প্রসেসরের চেয়ে এগিয়ে থাকে।
আইফোন ব্যবহারের প্রধান অসুবিধা
১. অত্যধিক দাম: আইফোনের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো এর আকাশছোঁয়া দাম। সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে থাকায় অনেকেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এটি কিনতে পারেন না।
২. কাস্টমাইজেশনের অভাব: অ্যান্ড্রয়েড ফোনে থিম, আইকন বা লঞ্চার পরিবর্তন করে নিজের মতো সাজানোর যে স্বাধীনতা পাওয়া যায়, আইফোনে তা খুবই সীমিত। আইওএস (iOS) খুব সুন্দর ও ছিমছাম হলেও, কাস্টমাইজেশন পছন্দ করা ব্যবহারকারীদের কাছে এটি একঘেয়ে লাগতে পারে।
৩. এক্সটার্নাল মেমোরির সুবিধা নেই: আইফোনে কোনো মাইক্রোএসডি কার্ড স্লট থাকে না। তাই ফোন কেনার সময় যে স্টোরেজ ভ্যারিয়েন্ট কেনা হয়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অতিরিক্ত স্টোরেজ লাগলে আইক্লাউড সাবস্ক্রিপশন কেনা ছাড়া উপায় থাকে না।
৪. ইকোসিস্টেমের ‘ফাঁদ’: অ্যাপলের ইকোসিস্টেম যেমন সুবিধার, তেমনি এটি বেশ ব্যয়বহুল। আইফোনের সঙ্গে ভালো অভিজ্ঞতা পেতে অ্যাপল ওয়াচ বা এয়ারপডস কিনতে গেলে অনেক বেশি টাকা গুনতে হয়। এমনকি চার্জার বা ক্যাবল নষ্ট হলেও অরিজিনাল এক্সেসরিজ কিনতে বেশ মোটা অংকের টাকা খরচ হয়।
৫. ফাস্ট চার্জিংয়ে পিছিয়ে: বর্তমানে অনেক অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ১২০ ওয়াট বা তারও বেশি ক্ষমতার ফাস্ট চার্জিং সুবিধা থাকলেও, আইফোন এক্ষেত্রে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে। আইফোন ফুল চার্জ হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়।
৬. ব্যাটারি চার্জ দ্রুত শেষ হয়: আইফোনে ব্যবহৃত ব্যাটারির ব্যাকআপ চার্জ খুব দ্রুত শেষ হয়।
আইফোনের বিবর্তনের ইতিহাস
শুরুর দিকের আইফোন থেকে আজকের অত্যাধুনিক আইফোন পর্যন্ত প্রতিটি মডেলেই অ্যাপল নিয়ে এসেছে নতুনত্ব। একনজরে দেখে নেওয়া যাক আইফোনের ঐতিহাসিক কয়েকটি মাইলফলক:
২০০৭ - প্রথম আইফোন (2G): স্মার্টফোনের ধারণাই পাল্টে দেয় এই ফোনটি। এতে কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ ছিল না, তবে মাল্টি-টাচ স্ক্রিন ছিল একটি বড় চমক।
২০০৮ - আইফোন 3G: যুক্ত হয় অ্যাপ স্টোর (App Store) এবং থ্রিজি নেটওয়ার্ক। অ্যাপ স্টোর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের এক নতুন দুনিয়া উন্মোচন করে।
২০১০ - আইফোন 4: ডিজাইনে আসে বড় পরিবর্তন। যুক্ত হয় রেটিনা ডিসপ্লে এবং সেলফি বা ফ্রন্ট ক্যামেরা, যা ভিডিও কলিংয়ের (ফেসটাইম) দরজা খুলে দেয়।
২০১১ - আইফোন 4S: পরিচয় ঘটে অ্যাপলের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট 'সিরি' (Siri)-এর সঙ্গে।
২০১৪ - আইফোন 6 ও 6 Plus: বড় স্ক্রিনের স্মার্টফোনের যুগে প্রবেশ করে অ্যাপল। এই মডেলটি আইফোনের ইতিহাসে অন্যতম সেরা বিক্রিত ফোন।
২০১৭ - আইফোন X: আইফোনের ১০ বছর পূর্তিতে হোম বাটন বাতিল করে আনা হয় ফুল-স্ক্রিন ডিজাইন, নচ (Notch) এবং ফেস আইডি (Face ID)।
২০২০ - আইফোন 12 সিরিজ: আইফোনে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় ফাইভ-জি (5G) কানেক্টিভিটি।
বর্তমান যুগ (আইফোন 15 সিরিজ ও তার পর): যুক্ত হয়েছে ডায়নামিক আইল্যান্ড, টাইটানিয়াম বডি এবং বহুল প্রতীক্ষিত ইউএসবি টাইপ-সি (USB Type-C) পোর্ট।
একনজরে আইফোনের মডেলগুলোর তালিকা
২০০৭ সাল থেকে বাজারে আসা আইফোনের মডেলগুলো নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
প্রকাশের বছর আইফোনের মডেলসমূহ
২০০৭: অরিজিনাল আইফোন (iPhone 2G)
২০০৮ : আইফোন 3G
২০০৯: আইফোন 3GS
২০১০: আইফোন 4
২০১১: আইফোন 4S
২০১২: আইফোন 5
২০১৩: আইফোন 5S, আইফোন 5C
২০১৪: আইফোন 6, আইফোন 6 Plus
২০১৫: আইফোন 6S, আইফোন 6S Plus
২০১৬: আইফোন SE (১ম প্রজন্ম), আইফোন 7, আইফোন 7 Plus
২০১৭: আইফোন 8, আইফোন 8 Plus, আইফোন X
২০১৮: আইফোন XR, আইফোন XS, আইফোন XS Max
২০১৯: আইফোন 11, আইফোন 11 Pro, আইফোন 11 Pro Max
২০২০: আইফোন SE (২য় প্রজন্ম), আইফোন 12 Mini, 12, 12 Pro, 12 Pro Max
২০২১: আইফোন 13 Mini, 13, 13 Pro, 13 Pro Max
২০২২: আইফোন SE (৩য় প্রজন্ম), আইফোন 14, 14 Plus, 14 Pro, 14 Pro Max
২০২৩: আইফোন 15, 15 Plus, 15 Pro, 15 Pro Max
২০২৪: আইফোন 16, আইফোন 16 প্লাস, আইফোন 16 প্রো, আইফোন 16 প্রো ম্যাক্স এবং আইফোন 16ই (ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত)
২০২৫: আইফোন 17, আইফোন এয়ার (অত্যন্ত পাতলা মডেল), আইফোন 17 প্রো, আইফোন 17 প্রো ম্যাক্স
২০২৬: আইফোন 17ই (মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত)

