Logo
Logo
×

আনন্দ নগর

গণমাধ্যমের ‘চটকদার শিরোনাম’

ক্লিকবেইটের ফাঁদে তারকার জীবন

ডিজিটাল যুগে খবরের লড়াই এখন আর শুধু তথ্যের নয়, এটি এখন মনোযোগের লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনাম। বিনোদন সাংবাদিকতায় এ প্রবণতা এমনভাবে বেড়েছে যে, অনেক সময় শিল্পীদের বাস্তব জীবনের চেয়ে তাদের ‘বিতর্কিত’ চিত্রটাই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে, গণমাধ্যমের এ ক্লিকবেইট সংস্কৃতি কি ইচ্ছাকৃতভাবে তারকাদের জীবনকে বিতর্কিত করে তুলছে? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ক্লিকবেইটের ফাঁদে তারকার জীবন

প্রতীকী ছবি

‘ক্লিকবেইট’ এই শব্দটি এখন অনলাইন দুনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত শব্দ। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে যারা ‘ইনকাম’ করেন তাদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর ইদানীংকালে গণমাধ্যমও এ ক্লিকবেইটের ফাঁদে পা দিয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া ভার্সনগুলো। তবে ঢালাওভাবে সব গণমাধ্যম এটা করছে না, নামসর্বস্ব গণমাধ্যমগুলোকেই এ অস্ত্র ব্যবহার করতে বেশি দেখা যায়। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও যে এ তালিকায় নেই, তা কিন্তু নয়। যত বেশি ‘ভিউ’, তত বেশি ‘হিট’, আর তাতে আসবে ডলার। এ ডলারের লোভেই হারিয়ে যাচ্ছে নীতি-নৈতিকতা। শুরুতেই জেনে নিই, ক্লিকবেইট কী এবং কেন এটি এত কার্যকর?

ক্লিকবেইট বলতে এমন শিরোনাম বোঝায়, যা অতিরঞ্জিত, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পাঠকের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে এবং তাকে ক্লিক করতে বাধ্য করে। ক্লিকবেইট মূলত ‘কিউরিসিটি গ্যাপ’ বা কৌতূহলের ফাঁক তৈরি করে কাজ করে। গবেষণা বলছে, মানুষ বাস্তব তথ্যের চেয়ে চটকদার শিরোনাম ও তারকার ছবি বেশি লক্ষ করে। এক আই-ট্র্যাকিং গবেষণায় দেখা গেছে, ভুয়া বা অতিরঞ্জিত শিরোনাম পাঠকের দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, যেখানে মূল তথ্য উপেক্ষিত হয়। এ ছাড়া ক্লিকবেইট ব্যবহার করলে কনটেন্টের এনগেজমেন্ট বাড়ে, লাইক, শেয়ার, ক্লিক সবই বাড়ে, যা সরাসরি বিজ্ঞাপন আয়ে রূপান্তরিত হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বিনোদন সাংবাদিকতায় প্রায়শই দেখা যায় এমন ক্লিকবেইট শিরোনাম-‘নায়িকার গোপন ভিডিও ফাঁস!, ‘বিচ্ছেদের পর অভিনেতার বিস্ফোরক মন্তব্য!’, ‘অভিনেত্রী যা বললেন, শুনলে চমকে যাবেন!’ বাস্তবে এসব খবরের ভেতরে থাকে সাধারণ বা প্রসঙ্গবিহীন তথ্য।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মিডিয়া যেমন বাজফিডের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোও ক্লিকবেইট শিরোনামের জন্য পরিচিত, যেখানে চমকপ্রদ ভাষা ব্যবহার করে পাঠক টানা হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমে ক্লিকবেইটের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ‘সেলেব্রিটিকেন্দ্রিক’ কনটেন্টে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি শিল্পীদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে? কিংবা কতটা বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়? ক্লিকবেইট শুধু পাঠক টানে না-এটি একটি ‘বিকল্প বাস্তবতা’ তৈরি করে।

ভুল ব্যাখ্যা ও অতিরঞ্জন : শিল্পীর একটি সাধারণ বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তা বড় বিতর্ক। ফলে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি হয়।

ব্যক্তিগত জীবনের অনধিকার চর্চা : শিরোনামে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিবাহ-বিচ্ছেদ, মানসিক অবস্থা-সবকিছুই ‘খবর’ হয়ে ওঠে, যা অনেক সময় যাচাইবিহীন।

সামাজিক মিডিয়ায় ভাইরাল বিতর্ক : অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়ায়, যা আবেগ বা ক্ষোভ তৈরি করে। ফলে ক্লিকবেইট থেকে জন্ম নেয় ‘রাগ-বেইটিং’-যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা তৈরি করা হয়।

দর্শক ও সমাজের ওপরও এ ক্লিকবেইটের প্রভাব পড়ে। বেষণা বলছে, ক্লিকবেইট শিরোনাম দর্শকের বিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং সংবাদমাধ্যমের মান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে। আরও দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া খবরের সঠিকতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। শুধু তাই নয়, ক্লিকবেইট পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং তথ্যের মান সম্পর্কে সন্দেহ বাড়ায়। ফলে, পাঠক ও দর্শকের মধ্যে ধীরে ধীরে ‘সব খবরই অতিরঞ্জিত’-এমন ধারণা তৈরি করে।

অনেক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় তারকা প্রকাশ্যে ক্লিকবেইট সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন। হলিউড অভিনেত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, তাদের বক্তব্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয় শুধু ট্রাফিক বাড়ানোর জন্য। বলিউড তারকারাও প্রায়ইশ অভিযোগ করেন, ‘একটি সাক্ষাৎকার থেকে একটি লাইন তুলে এনে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীর বলেছেন, ‘গণমাধ্যমগুলো আমি যা বলি, সেটি নয়, তারা যা চায়, সেটাই শিরোনাম হয়।’ প্রশ্ন হচ্ছে, কেন গণমাধ্যম এই পথে হাঁটছে? এর কয়েকটি কারণও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। তার মধ্যে রয়েছে-

ডিজিটাল প্রতিযোগিতা : অনলাইন মিডিয়ায় টিকে থাকতে হলে ক্লিক দরকার।

বিজ্ঞাপননির্ভরতা : যত বেশি ক্লিক, তত বেশি আয়-এ অর্থনীতি ক্লিকবেইটকে উৎসাহ দেয়।

অ্যালগরিদমের চাপ : সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বেশি এনগেজমেন্ট পাওয়া কনটেন্টকে এগিয়ে দেয়, ফলে সংবাদমাধ্যমও সেই পথেই হাঁটে।

তাই বলে কী এভাবেই চলবে সবকিছু? এর কী কোনো সমাধান নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে সমাধানের পথও আছে। জানিয়েছেন, কীভাবে এটা থেকে বের হওয়া সম্ভব?

নৈতিক সাংবাদিকতা জোরদার করা : শিরোনাম যেন তথ্যভিত্তিক হয়, বিভ্রান্তিকর না হয়-এটি নিশ্চিত করতে হবে।

মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো : পাঠক ও দর্শকদের শেখাতে হবে, শিরোনাম নয়, পুরো খবর পড়তে ও দেখতে।

প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব : ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ইতোমধ্যে ক্লিকবেইট কমাতে অ্যালগরিদম পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

শিল্পীদের সক্রিয় ভূমিকা : তারকারা নিজেরাই ভুল খবরের প্রতিবাদ করলে সচেতনতা বাড়ে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি : সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় আরও দায়বদ্ধ হতে হবে।

ক্লিকবেইট শিরোনাম হয়তো সাময়িকভাবে পাঠক টানে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং শিল্পীদের জীবনকে অযথা বিতর্কিত করে তোলে। তথ্যের যুগে সত্যের চেয়ে যদি চটক বেশি মূল্য পায়, তাহলে শুধু শিল্পী নয়-সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এখনই সময় ‘ক্লিক’ নয়, ‘বিশ্বাস’-এর সাংবাদিকতায় ফিরে যাওয়ার।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম