রিমেক গানের জনপ্রিয়তা
নস্টালজিয়া নাকি সৃজনশীলতার সংকট
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুরোনো গানের সুর, কথা ও আবেগকে নতুন সংগীতায়োজন ও আধুনিক পরিবেশনায় ফিরিয়ে আনার প্রবণতা ইদানীং বেশ জনপ্রিয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি, নতুন প্রজন্মের রুচি এবং পরিচিত সুরের প্রতি শ্রোতাদের নস্টালজিয়া, সব মিলিয়ে রিমেক গান সহজেই তৈরি করছে আগ্রহ। অনেক সময় পুরোনো জনপ্রিয় গান নতুন শিল্পীর কণ্ঠে ভিন্ন মাত্রা পায় এবং তরুণ শ্রোতাদের কাছেও সহজে পৌঁছে যায়। দেশের সংগীতাঙ্গনে পুরোনো জনপ্রিয় গান মূল শিল্পীর পরিবর্তে ভিন্ন কণ্ঠ ও সংগীতায়োজনে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা নতুন নয়; তবে ইউটিউব, ফেসবুক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগে এর বিস্তার যেন আরও বেড়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, শ্রোতার এ আগ্রহ কি নিছক নস্টালজিয়া, নাকি নতুন সৃষ্টির সংকটও এর পেছনে কাজ করছে?
বাংলাদেশে রিমেক গানের উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় উদাহরণগুলোর একটি ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলমের কণ্ঠে ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমার এ গানটি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরে সংগীতশিল্পী পান্থ কানাই গানটির নতুন সংস্করণ তৈরি করেন এবং সেটিও শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। চলতি বছর সেই ধারাবাহিকতায় পান্থ কানাই ‘আবার চুমকি’ নামে গানটি নতুনভাবে সিক্যুয়ালরূপে উপস্থাপন করেছেন। নতুন ভিডিওতেও ষাট-সত্তরের দশকের সিনেমার আবহ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এছাড়া রিমেকের তালিকায় রয়েছে সিনেমার বহু স্মরণীয় ও জনপ্রিয় গান। ‘তুমি আমার জীবন’, ‘হৃদয়ের আয়না’, ‘তুমি চাঁদের জোছনা নও’, ‘আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা’, ‘অনেক সাধনার পরে’, ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি’-এসব গানে নতুন সংগীতায়োজন ও কণ্ঠ দিয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের কণ্ঠশিল্পী ও সংগীতপরিচালক ইমরান মাহমুদুল। বিশেষ করে ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অনুতপ্ত’ সিনেমায় কুমার শানুর কণ্ঠে গাওয়া ‘আমার মনের আকাশে আজ’ গানটির নতুন সংস্করণে ইমরান নিজেই কণ্ঠ ও সংগীতায়োজন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, গানটি শুনেই বড় হয়েছেন; মূল কথা-সুর ঠিক রেখে নিজের মতো করে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করেছেন।
লোকগানেও রিমেকের ঢেউ কম নয়। রিমিক্স এবং ফিউশন গানে কণ্ঠ ও সুর দিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া তার প্রথম রিমিক্স ও ফিউশনধর্মী অ্যালবাম ‘কৃষ্ণ’ প্রকাশের পর তিনি দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এ অ্যালবামের ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ গানটির মূল রচয়িতা ও সুরকার হলেন সিলেটের মরমী গীতি কবি ও সুফি সাধক আরকুম শাহ। এর আধুনিক সংগীতায়োজন বা রিমিক্স করেছেন হাবিব ওয়াহিদ এবং মূল কণ্ঠ দিয়েছেন কায়া। সিলেট অঞ্চলের বিয়ের গান ‘আইলো রে নয়া দামান’ মুজা ও তোসিবার কণ্ঠে নতুনভাবে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০২১ সালে গানটি বাংলাদেশের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছিল; এর সঙ্গে তৈরি হয় অসংখ্য ভিডিও ও নাচের পরিবেশনা। গানটির মূল রচয়িতা নিয়ে অবশ্য বিতর্কও রয়েছে, পুরোনো বেতার রেকর্ডে শিল্পী ও রচয়িতার তথ্য নিয়েও অস্পষ্টতা পাওয়া যায়।
একই সময়ে ‘বুক চিন চিন করছে’ গানটি নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পৌঁছে দেয় ‘শিল্পী’ নাটকের সংস্করণ। মূল গানটি ‘বাস্তব’ সিনেমায় এন্ড্রু কিশোর ও ডলি সায়ন্তনীর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছিল; নতুন সংস্করণে কণ্ঠ দেন জাহেদ পারভেজ পাভেল এবং সংগীত পুনর্বিন্যাস করেন আভ্রাল সাহির। ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওটি কয়েক কোটি ভিউ পেয়েছে, যা ডিজিটাল যুগে রিমেকের বাজার কতটা বড় হতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত। এছাড়া আরও অনেক শিল্পী রিমেক গানে কণ্ঠ দিয়ে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেক সময় মূল শিল্পীরাই নিজেদের পুরোনো গান নতুন করে তুলছেন। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎও বছর কয়েক আগে নিজেরই গাওয়া পুরোনো ৪৮টি গান নতুনভাবে প্রকাশের জন্য বাছাই করেছিলেন। পুরোনো গান নতুন করে প্রকাশের বিষয়ে তার যুক্তি ছিল, অনেক ভালো গান একসময় যথেষ্ট শ্রোতার কাছে পৌঁছায়নি; নতুন সংগীতায়োজনে সেগুলো আবার শ্রোতার সামনে আনা যেতে পারে। একইসঙ্গে তিনি সংগীতাঙ্গনে কথা ও সুরের সংকটের কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে বাংলাদেশে রিমেকের ইতিহাস আরও পুরোনো। ক্যাসেট-সিডির যুগে অনেক রিমেক অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছিল। বিশেষ করে সাউন্ডটেক, সংগীতা বা লেজার ভিশনের মতো অডিও কোম্পানিগুলো নব্বইয়ের দশকে এ ধরনের প্রচুর মিক্সড রিমেক অ্যালবাম প্রকাশ করত। যেখানে পুরোনো দিনের সিনেমার জনপ্রিয় গান কিংবা আধুনিক গানকে কনটেম্পোরারি পপ ও সিন্থেসাইজার মিউজিক দিয়ে রিমেক করতেন তৎকালীন জনপ্রিয় শিল্পীরা। এছাড়া মূল শিল্পীদের কেউ কেউ পরে নিজেদের জনপ্রিয় গানও নতুন করে রেকর্ড করেন। আবদুল জব্বারের ‘ওরে নীল দরিয়া’, সৈয়দ আবদুল হাদীর ‘একবার যদি কেউ’, এন্ড্রু কিশোরের ‘ফিরে ফিরে আসি’, সাবিনা ইয়াসমীনের ‘এই মন তোমাকে দিলাম’সহ বহু গান নতুনভাবে প্রকাশ হয়েছে। নতুনভাবে প্রকাশিত এসব গান শ্রোতামহলে সাড়াও জাগিয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে মূল গানের শিল্পীই নতুনভাবে গানটি রিমেক করে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মূল শিল্পীর বাইরে যারা গেয়েছেন, তাদেরও কিছু গান শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। আরও কিছু প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রোতারা কেন বারবার পুরোনো গানে ফিরছেন? সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী মনে করেন, ‘নস্টালজিয়া এখন শুধু স্মৃতি নয়, এটি বিনোদন শিল্পের একটি পণ্য, পুরোনো আবেগকে নতুন মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে।’ অন্যদিকে কণ্ঠশিল্পী ধ্রুব গুহ রিমেককে সংরক্ষণের একটি ভালো পন্থা হিসাবে দেখলেও সতর্ক করেছেন, মূল শিল্পীর স্বকীয়তা নষ্ট করা বা ভালো গানের মান নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়।
পুরোনো গান নতুনভাবে সৃষ্টি ও প্রকাশের বিষয়ে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, রিমেক আর নকল এক নয়। নকীব খানের সুর করা রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদা মাটির কোনো মূর্তি নয়’ গানটি তরুণ শিল্পীদের কণ্ঠে নতুনভাবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে মূল স্রষ্টার অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। আবার ২০২৬ সালে রেনেসাঁর ‘আজ যে শিশু’ নতুন করে গেয়েছেন নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া ও বাপ্পা মজুমদার। ওই সময় বাপ্পা গণমাধ্যমে বলেছেন, কিছু গানের আবেদন চিরকাল থেকে যায়, সেই আবেদন নতুনভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়াই উদ্দেশ্য।
তবে বিপরীত চিত্রও আছে। যখন পুরোনো গানকে শুধু পরিচিত নাম ও সুরের ওপর ভর করে বাজারে ছাড়া হয়, অথচ নতুন সংগীতায়োজন বা পরিবেশনায় সৃজনশীলতা থাকে না, তখন সেটি হয়ে উঠতে পারে সৃষ্টিশীলতার শর্টকাট। সংগীতাঙ্গনে নতুন গান তৈরির ঝুঁকি, প্রচারণার খরচ এবং শ্রোতা পাওয়ার অনিশ্চয়তার তুলনায় পরিচিত গানের ওপর বিনিয়োগ অনেক সময় নিরাপদ বলে মনে করে অনেকে।
তাই রিমেককে এক কথায় ‘সৃজনশীল সংকট’ বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি রিমেককে ‘শিল্পের নতুন উদ্ভাবন’ বলাও কঠিন। ভালো রিমেক অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে; দুর্বল রিমেক শুধু অতীতের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ তাই পুরোনো গান ফিরিয়ে আনা নয়, পুরোনো গানের পাশাপাশি এমন নতুন গান তৈরি করা, যেগুলো একদিন আজকের প্রজন্মের নস্টালজিয়ায় পরিণত হবে।
কারণ, আগামী দিনের শ্রোতারা যদি শুধু অতীতের গানই নতুন করে শুনতে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আজকের কোন গানগুলো ভবিষ্যতের রিমেক হবে?
