Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ ও কোচ সংকট চরমে

ট্রেনে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে

শিপন হাবীব

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রেনে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে

রেলে উচ্চগতিসম্পন্ন নতুন ইঞ্জিন-কোচ কিনেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন এসব ইঞ্জিন-কোচ রেলবহরে যুক্ত হলেও গড়ে ৫৭ কিলোমিটার গতি নিয়ে চলছে ট্রেন। অপরদিকে আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন ট্রেন বাতিল হচ্ছে, বন্ধ হয়ে পড়ে আছে ৭৯টি ট্রেন। এমন অবস্থায় ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ ও ট্রেন পরিচালনা স্বাভাবিক রাখা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন ফেইলর ও কোচ দেবে যাওয়ার মতো ঘটনা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, রেলকে বাঁচাতে দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধের পাশাপাশি ইঞ্জিন-কোচ সংকটের স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

যথাসময়ে প্রকল্প শেষ করতে না পারা এবং প্রকল্প ঘিরে চরম দুর্নীতি-লুটপাটে রেলের জুড়ি নেই। গত ১৬ বছরে সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে রেলে। বাস্তবায়িত প্রকল্পের সুফল প্রায় শূন্য। নতুন রেলপথ নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৮৫ শতাংশ খরচ করা হয়েছে। কিন্তু ট্রেনের গতি বাড়েনি, বাড়েনি ট্রেনের সংখ্যাও।

বর্তমানে ২৭৫টি ট্রেন চলাচল করছে। চালু এসব ট্রেনের অন্তত ৭০টি ট্রেন প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল হলে বন্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শুধু প্রকল্পের দিকে দৌড়াচ্ছেন। রেলকে স্বাভাবিক রাখতে ইঞ্জিন-কোচ সংকটের সমাধান খুব জরুরি।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক বা আরএস) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, পুরোনো, আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ প্রায়ই নষ্ট হয়ে পড়ছে। ওয়ার্কশপগুলোতে ভারী কাজের জন্য ইঞ্জিন-কোচ পাঠালে যথাসময়ে মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে ইঞ্জিন-কোচ স্বল্পতা চরমে উঠেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু ওয়ার্কশপগুলোতে যুগের পর যুগ ধরে লোকবল স্বল্পতা রয়েছে। বরাদ্দ নেই, নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ। ফলে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা রোলিং স্টকের স্তূপ বাড়ছে। সামনে ঈদযাত্রা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণসহ বিশেষ ট্রেন চালানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এমন অবস্থায় আমরা দিন-রাত কাজ করছি, তবু শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া রোলিংস্টক ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। নতুন ইঞ্জিন-কোচ, যন্ত্রাংশ ক্রয় জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ওয়ার্কশপ উন্নয়ন, লোকবল বাড়ানো এবং এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি।

রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীতে দেশে ৪৮৬টি ট্রেন চলাচল করত। বর্তমানে চলছে ২৭৫টি। এর মধ্যে আন্তঃনগর ১২০টি, ১২৮টি কমিউটার ও মেইল ট্রেন, ৮টি কনটেইনার ট্রেন এবং ১৯টি মালবাহী ট্রেন। পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি ও পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭টি যাত্রী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলা মিতালী ও মৈত্রী এক্সপ্রেসসহ ৬টি আন্তঃদেশীয় ট্রেনও বন্ধ রয়েছে। ট্রেন স্বল্পতা ও শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বছরের পর বছর সাধারণ যাত্রীরা রেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টসম্যান ও লোকবল স্বল্পতায় ৮৫টি রেলওয়ে স্টেশন বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে গোপালগঞ্জ রেলপথে নবনির্মিত ৪টি রেলওয়ে স্টেশনসহ সারা দেশে অন্তত ১৩টি নতুন রেলওয়ে স্টেশন ব্যবহার হচ্ছে না। ট্রেনের গতি ও নতুন ট্রেন না বাড়লেও লোকসান বাড়ছে লাফিয়ে। গত অর্থবছরে রেল লোকসান দিয়েছে প্রায় ২৮শ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হবে বলে বলছে রেল।

জানা যায়, আসছে ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ৫ জোড়া ঈদ স্পেশাল ট্রেন পরিচালনাসহ অন্তত ৬৪টি কোচ বিভিন্ন ট্রেনে সংযোগ করা হবে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের মেকানিক্যাল ও পরিবহণ দপ্তরের দুই কর্মকর্তা বলেন, প্রতি ঈদেই ‘রাজনৈতিক এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে ঈদ স্পেশাল ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ সংযোগের কথা বলা হয়। মূলত চলমান বিভিন্ন ট্রেন থেকে কোচ কেটে এবং লোকাল কিংবা মেইল ট্রেন বন্ধ রেখে ‘ঈদ স্পেশাল’ ট্রেন চালু করা হয়। তাছাড়া প্রতিদিন যেসব ট্রেন বাতিল হচ্ছে, কোচ ইঞ্জিন অকেজো হয়ে পড়ছে-এসব মেরামতে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

রেলওয়ে অপারেশন দপ্তরের নথি অনুযায়ী, ইঞ্জিন-কোচের অভাবে প্রতিদিনই ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে লোকাল, মেইল, কমিউটার ও মালবাহী মিলে ৫৫৭টি ট্রেনের চলাচল বাতিল হয়েছে। কোচ বাতিল করা হয়েছে ৭৭৫টি। প্রায় দেড় হাজারের বেশি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালে পড়ে আছে। বর্তমানে মালবাহী ট্রেন চলাচল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যাত্রীবাহী ট্রেন বাতিল ও কনটেইনার পরিবহণ না করায় প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি টাকা লোকসান গুনছে রেল। অপরদিকে অকেজো ইঞ্জিন-কোচ মেরামতে যে ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন, তা রেলওয়ে বহরে নেই। এতে করে অকেজো ইঞ্জিন-কোচসহ রোলিং স্টকসামগ্রী দিন দিন স্তূপ হয়ে পড়ছে।

রেল সূত্রের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অন্তত ৫ রেলপথমন্ত্রী সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। ১৮শ কোটি টাকার প্রকল্প ১৮ হাজার কোটি টাকায় বাস্তবায়ন করেছেন। প্রতি কিলোমিটার রেলপথ তৈরিতে ২৭৭ কোটি টাকাও খরচ দেখানো হয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সমপরিমাণ রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয় ২৩ থেকে ৬৫ কোটি টাকা। রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় অধিকাংশ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। রেলের বিশেষ দুটি নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ওই প্রকল্প ঘিরে অন্তত ১৫০টি ট্রেন চলার কথা। বর্তমানে চলছে মাত্র ৮টি ট্রেন।

পরিকল্পনা দপ্তর সূত্র বলছে, রেলের অবকাঠামোর মোট ব্যয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ রোলিং স্টক ক্রয়ে খরচ করা হলে বর্তমানে রেলবহরে ৫০০ ইঞ্জিন ও ৫ হাজারের বেশি কোচ যুক্ত হতো। একটি ইঞ্জিন ১৯ থেকে ২৩ কোটি টাকা এবং একটি কোচ দেড় কোটি থেকে সোয়া ২ কোটি টাকায় ক্রয় করা যায়। সেই হিসাবে ইঞ্জিন ক্রয়ে ১০ হাজার এবং কোচ ক্রয়ে ১০ হাজার, মোট ২০ হাজার কোটি টাকার রোলিং স্টক ক্রয় করা হলে, বর্তমানের চেয়ে প্রায় তিনগুণ (৮২৫টি ট্রেন) বেশি ট্রেন চালানো সম্ভব ছিল। সূত্রটি জানায়, ইঞ্জিন ও কোচ ক্রয়ে খুব বড় ধরনের দুর্নীতি-লুটপাট করা যায় না। তাছাড়া এসব ক্রয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হয় না। অপরদিকে রেলপথ নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৩-৪ বার করে সময় বৃদ্ধি ও ব্যয় বাড়ানো যায়। ফলে রেলপথমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্মকর্তারা রোলিং স্টকসামগ্রী ক্রয়ে নজর দেননি।

এদিকে নতুন ইঞ্জিনও বিকল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রেলের উন্নয়নে প্রায় ১৬ বছরে ৭০টি ইঞ্জিন ক্রয় করা হয়েছে। আর ৩০টি ইঞ্জিন অনুদান হিসাবে দিয়েছে ভারত। নতুন কেনা ৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৩০টি ইঞ্জিন আমেরিকান ও অত্যাধুনিক। ৩২০০ হর্স পাওয়ারের এসব ইঞ্জিন দেশে আনার পর থেকেই অকেজো হয়ে পড়তে থাকে। ইঞ্জিনগুলো ক্রয়ে চরম দুর্নীতি-লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় রেলের সাবেক মহাপরিচালক সামসুজ্জামানসহ ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। বর্তমানে ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্য ২০টি ইঞ্জিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। চলমান ১০টি ইঞ্জিনও বিভিন্ন সময় চলন্ত অবস্থায় ফেইলর হচ্ছে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে ইঞ্জিন ও কোচ স্বল্পতা চরমে উঠেছে। যত্রতত্র ইঞ্জিন-কোচ অকেজো হয়ে পড়ছে। বাতিল করতে হচ্ছে ট্রেন। এমন অবস্থায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ার সঙ্গে রেলওয়ে আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, রেলে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে বলে বলা হচ্ছে-তার সুফল তো সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। দুর্নীতি-লুটপাটের উন্নয়ন যে হয়েছে, তা প্রমাণিত। মন্ত্রীসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে লুটতরাজ হয়েছে। বর্তমান সরকার নিশ্চয়ই জনবান্ধব রেলসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। চলমান রেলপথ ঠিক রাখাসহ রেলের গতি বাড়িয়ে রোলিং স্টক ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে। রেলে যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি-অনিয়ম না করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম