Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

আজ বিশ্ব নারী দিবস

নারীর অগ্রগতিতে বড় বাধা নিরাপত্তা

শিপন হাবীব

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নারীর অগ্রগতিতে বড় বাধা নিরাপত্তা

আজ ‘বিশ্ব নারী দিবস’। প্রতিবছর দিনটি আসে, আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে আবার চলেও যায়। নারী অধিকার নিয়ে সভা হয়, মিটিং-মিছিলে স্লোগান ওঠে, কিন্তু বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটে না। নারীর অগ্রগতিতে আজও সবচেয়ে বড় বাধা যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা। রাস্তাঘাট বা কর্মস্থল তো বটেই, এমনকি ঘরের চার দেওয়ালের ভেতরেও নারী ও কন্যাশিশুরা আজ নিরাপদ নয়। পরিসংখ্যান বলছে, নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের সিংহভাগই ঘটাচ্ছে আপনজন কিংবা প্রতিবেশী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে দিন দিন বাড়ছে এ ধরনের অপরাধ। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, শুধু আইন দিয়ে নয়, এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। বিচার কিংবা সাজা এমনকি ফাঁসি দিয়েও এমন বর্বর ধর্ষণ ও হত্যা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আইন হয়েছে, খুন করলে ফাঁসি। এটা প্রায় সবাই জানেন, কিন্তু খুন কি বন্ধ হচ্ছে? তবে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বিচার সম্পন্ন করতেই হবে। দেশে যে পরিমাণ ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা ঘটছে, এসবের বিচারে ২ শতাংশের কম অপরাধীরই শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছর ২১ হাজার ৯৩৬টি নারী ও শিশু নির্যাতন-ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ১৭৯ জন নারী ও শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৩১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। চলতি বছরের ২ মাসেই ৬ নারী-শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, কোনো সরকারের সময়ই নারী-শিশুরা নিরাপদ ছিল না। সমাজে এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে সমবেত আওয়াজ উঠছে না। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়সহ আর্থিক ক্ষমতা দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ভয়-ভীতির মাধ্যমে সবকিছু ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। এমন বর্বর ধর্ষণকাণ্ডে সালিশি হয় কি করে, যারা সালিশি করছে তাদের বিচার হচ্ছে না কেন। তিনি বলেন, নতুন সরকার ৬ মাসের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের কোনো কর্মসূচি নেই।

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দেশে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণ শেষে হত্যার মতো ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ধর্ষক বা নির্যাতনকারীদের পক্ষেই বেশির ভাগ মানুষ অবস্থান নিচ্ছে। অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে, শূন্য সহিংসতার নীতি অনুসরণ করে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে একটা টাস্কফোর্স ঘোষণার দাবি জানান তিনি।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিশ্বে এ মুহূর্তে ৩৭ কোটি নারী অর্থাৎ প্রতি আটজনে একজন নারী ১৮ বছরের আগেই ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। দেশের ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য বলছে, গত ২৫ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬৪ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। মামলা হয়েছে ২০ হাজারেরও কম। এসব মামলায় ৩ শতাংশের কম রায় হয়েছে।

জানা যায়, নারীর ওপর নির্যাতনকারীদের শাস্তি দিয়ে বাংলাদেশে যে আইন রয়েছে, তা শক্ত আইন। কিন্তু বিচার পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রতায় নির্যাতিতা ও তার পরিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পায় না। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশে অঙ্গছেদ আইন রয়েছে, ভারতসহ কিছু দেশে এ আইন করতে সোচ্চার রয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। ভারতের নির্ভয়া কাণ্ডের পর ধর্ষণের জন্য কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করতে বর্মা কমিটি গঠন হয়। সেই কমিটির কাছেও অঙ্গছেদের মতো সুপারিশ করা হয়েছিল। নারী শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমেরিকার বেশকিছু রাজ্য, চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রাসায়নিকের মাধ্যমে অঙ্গছেদের শাস্তি রয়েছে। রাশিয়া, পোল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশও এই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ধর্ষণ যেভাবে বাড়ছে কঠিন শাস্তির বিকল্প নেই। তবে শাস্তি দিয়ে এমন বর্বরতা রোধ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ধর্ষণ প্রতিরোধ ও বিচার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণকে রাষ্ট্র ও সমাজের সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।

১০ দফা দাবি : এদিকে নারীর নিরাপত্তায় বাজেট বৃদ্ধিসহ ১০ দফা দাবি জানিয়েছে নারী উন্নয়ন শক্তি। শনিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে সংগঠনটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সর্ব প্রথম নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ উন্নয়ন বাস্তবায়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সভায় কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধসহ ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন, সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন। নারী নেত্রী সাহিদা ওয়াহাবের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন নাসিমা খান, সুলতান মোহাম্মদ রাজ্জাক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন প্রমুখ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম