Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

ঈদের আগে ঢাকায় সক্রিয় অপরাধী চক্র

ইকবাল হাসান ফরিদ

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের আগে ঢাকায় সক্রিয় অপরাধী চক্র

রমজান শেষের দিকে। ঈদের আনন্দে মুখর রাজধানী। টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখো মানুষের ভিড়। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জমজমাট শপিংমল। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ এখন তুঙ্গে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই রাজধানীজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। সূত্র বলছে, ঈদুল ফিতর সামনে রেখে প্রতি বছরই রাজধানী হয়ে ওঠে ‘মৌসুমি’ অপরাধীদের অন্যতম চারণভূমি। তবে এদের রুখতে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অব্যাহত রয়েছে অভিযান। ধরাও পড়ছে অপরাধীরা। ঈদে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণের প্রতি মানিস্কট সেবা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত সতর্কতা ও নজরদারির মধ্যেও সক্রিয় রয়েছে পকেটমার, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির সদস্যরা। ঈদ বোনাস কিংবা কেনাকাটার কষ্টার্জিত টাকা হাতিয়ে নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ওঁৎ পেতে রয়েছে এসব চক্র। অনলাইন প্রতারণাসহ হরেক রকম প্রতারণায় নিয়োজিত রয়েছে আরও একাধিক চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছিনতাইয়ে জড়িতদের বেশির ভাগই কিশোর, তরুণ ও গাড়িচালক। এ ছাড়া অন্য পেশার লোকজনও ঈদ সামনে রেখে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কিছু ভুক্তভোগী মামলা করেন, অনেকেই করেন না। যে কারণে অনেক ঘটনাই অজানা থেকে যায়। রাজধানীর অন্যতম ক্রাইম জোন মোহাম্মদপুর এলাকা। রমজানের শুরু থেকেই এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাঁড়াশি অভিযান চলমান রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছে তারা। এরপরও এলাকায় চলছে ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধ। সম্প্রতি তারাবির নামাজ শেষে মোহাম্মদপুরে হাটতে বের হয়ে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মো. মোতাহার হোসেন। দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে দুটি আইফোন, মানিব্যাগ ও একটি দামি ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। হামলায় তিনি আহতও হন। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হলে পুলিশ দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে এবং মোবাইল ফোন দুটি উদ্ধার করে। গভীর রাত বা ভোরে সক্রিয় হয়ে উঠছে ‘টানা পার্টি’। মোটরসাইকেল বা রিকশায় এসে মুহূর্তে পথচারীর ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর আশপাশের জেলা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে কয়েকশ’ অপরাধী ইতোমধ্যে ঢাকায় এসে অবস্থান নিয়েছে। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এদের ‘মৌসুমি অপরাধী’ বলা হয়। সারা বছর গ্রামাঞ্চলে ছোটখাটো পেশায় যুক্ত থাকলেও ঈদের সময়টাকে তারা ‘উপার্জনের মৌসুম’ হিসেবে বেছে নেয়। বড় অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়ে যায়। কেউ বাস টার্মিনালে যাত্রী সেজে, কেউ আবার শপিংমল ও এর আশপাশে হকার বা ক্রেতা সেজে ঘুরে বেড়ায়। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। সহযাত্রী সেজে তারা মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। পরে বিস্কুট, শরবত বা পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে খাইয়ে দেয়।

ভুক্তভোগী অচেতন হয়ে পড়লে মুহূর্তেই টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। অন্যদিকে মলম পার্টির সদস্যরা জনাকীর্ণ বাস বা ভিড়ের মধ্যে মানুষের চোখে মরিচের গুঁড়ো বা বিষাক্ত মলম লাগিয়ে দেয়। এতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়লে সুযোগ বুঝে মোবাইল, মানিব্যাগ বা ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অচেতন হওয়া রোগীরা এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জানা গেছে, রাজধানীর নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার এবং শপিংমলগুলোতেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পকেটমার সিন্ডিকেট। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনায় ১৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ২৯টি এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৪২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে এ ধরনের ঘটনায় আরও ১৩৭টি মামলা হয়েছে। আর গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি অভিযোগ জমা পড়ে।

পুলিশের তথ্য বলছে, এসব ঘটনার প্রায় ৬৫ শতাংশই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত হয়। প্রায় ২০ শতাংশ ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত এবং বাকি ১৫ শতাংশ ছদ্মবেশে বা কথার ছলে পথচারীদের বিভ্রান্ত করে সংঘটিত হয়।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৮টি ক্রাইম জোনে ৪৩২টি হটস্পট রয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬ জন, মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ২১২ জন, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৫৪ জন সক্রিয় রয়েছে।

ঈদের বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ার সুযোগ নিচ্ছে জালনোট চক্রও। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, উন্নত স্ক্যানার ও প্রিন্টার ব্যবহার করে জাল টাকা তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে একটি চক্র। এ ছাড়া অনলাইনে বাসের টিকিট বা কেনাকাটার নামে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অফার দিয়ে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ওটিপি সংগ্রহ করে ব্যাংক হিসাব খালি করে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শপিংমল ও বাস টার্মিনালগুলোতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, পরিবহন টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতা দেখলে নাগরিকদের দ্রুত জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে জানাতে বলা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেছেন, রাজধানীকে নিরাপদ রাখতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম