Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

যশোর গণহত্যা দিবস আজ

শহীদদের অধিকাংশই পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

ইন্দ্রজিৎ রায়

ইন্দ্রজিৎ রায়

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদদের অধিকাংশই পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসার ২৩ শহীদদের ঐতিহাসিক গণকবর। ছবি: যুগান্তর

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল। যশোর শহরের গুরুদাসবাবু লেনে পাক হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব চলে। বাড়ি থেকে অ্যাডভোকেট সৈয়দ আমীর আলী ও তার তিন ছেলে সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র সৈয়দ নুরুল ইসলাম বকুল ও সৈয়দ শফিকুর রহমান জাহাঙ্গীর এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী আজিজুল হককে পাক সেনারা ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়।

শুধু সৈয়দ আমীর আলী ও তার তিন সন্তান নন, একইদিনে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন যশোরের অর্ধশতাধিক রাজনীতিক, শিক্ষক, ছাত্র ও পেশাজীবী ও ধর্মীয় নেতা। ২০২৪ সালে শহীদদের কয়েকজনকে শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। তবে বাকিরা পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শহীদদের স্মরণে নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভও। শহীদদের স্বীকৃতির দাবিতে বছরের পর বছর ঘুরছেন স্বজনরা। এ বছর যশোর গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে আজ শনিবার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে শংকরপুর বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিকালে শহরের টাউন হল ময়দানে আলোচনা সভা হবে।

জানা যায়, সারা দেশের মতো যশোরেও ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতি। একে থামিয়ে দিতে নৃশংস হয়ে ওঠে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। শহরের বিভিন্ন স্থানে তারা চালাতে থাকে বর্বরোচিত হামলা। নৃশংসতম হামলার ঘটনাগুলোর অনেকগুলোই ঘটে ৪ এপ্রিল। এদিন শহরের বিভিন্ন বাড়িতে ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাক বাহিনী মধ্যযুগীয় তাণ্ডব চালায়। প্রকাশ্যে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে অর্ধশতাধিক বাঙালিকে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী শহরের রেলস্টেশন এলাকার শেখ আব্দুর রহিম সূত্রে জানা যায়, ৪ এপ্রিল ভোরে শহরের রেলস্টেশন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন শরিফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় স্থানীয় বিহারিদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাণ্ডব চালায়। মাদ্রাসার বড় হুজুর আবুল হাসান যশোরী থামাতে গেলে হানাররা জানায়, এরা সবাই পাকিস্তানের শত্রু। এরপরই নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। মাদ্রাসা প্রাচীরের ওপর থেকে এই দৃশ্য দেখে পালিয়ে যান আব্দুর রহিম। পরে দুপুরের দিকে তিনি এবং তার ভাই জাহাঙ্গীর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এসে দেখেন রক্তে ভেসে যাওয়া গোটা অঞ্চলে শুধু লাশ আর লাশ। এখানেই পাওয়া যায় ২৩ জনের লাশ। ১৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকি ৭ জনের পরিচয় আজও জানা যায়নি।

মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে রহিম ও জাহাঙ্গীর লাশগুলো একের পর এক সাজিয়ে মাটিচাপা দেন। সেদিনের নৃশংস ঘটনাটি বর্তমানে মাদ্রাসা ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন একই পরিবারের তাহের উদ্দিন, এবিএম আব্দুল হামিদ ও এবিএম কামরুজ্জামান এবং একই এলাকার কাজী আব্দুল গণি ও তার ছেলে কাজী কামরুজ্জামান। একই পরিবারের ৩ সদস্য তৎকালীন খুলনা কমিশনার অফিসের কর্মচারী দীন মোহাম্মদ, সম্মিলনী স্কুলের শিক্ষক আইয়ুব হোসেন ও কাজী আব্দুল কালাম আজাদ, রেলস্টেশন মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা হাবিবুর রহমান ওরফে কাঠি হুজুর, শহীদ সাংবাদিক গোলাম মাজেদের বাবা যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রউফ, শহর আলীর ছেলে আবু কালাম এবং মাদ্রাসার ছাত্র আতিয়ার রহমান, নোয়াব আলী, লিয়াকত আলী, মাস্টার আব্দুর রফিক ও আক্তার হোসেন। তাদের মধ্যে ২০২৪ সালে রেলস্টেশন মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা হাবিবুর রহমান ও জিলা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রউফ ও অ্যাড. সৈয়দ আমীর আলী শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন।

একই দিন পাক সেনারা শহরের ক্যাথলিক গির্জায়ও আক্রমণ করে। গির্জার ইতালিয়ান ফাদার মারলো ভারনেসিসহ ৬ জনকে হত্যা করে হায়েনারা। তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের সভাপতি এমএম কলেজের ছাত্র মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এমএম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মোছাদ্দেদ আলী, ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক, নিখিল রায়, নাসিরুল আজিজ, অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী, তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট রহমতউল্লাহ, ইপিআর সদস্য আব্দুল মান্নান, ক্রিকেটার স্বপন বিশ্বাস, ডা. নাসির উদ্দিন ও মিসেস নাসির, আব্দুর রহমান, লুৎফর রহমান, জাবেদা লুৎফর, চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ, মাহবুব এবং ভোলা ট্যাংক রোডের অবসরপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী একই দিন নিহত হন।

যশোর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আফজাল হোসেন দোদুল জানান, গণহত্যার শিকার শহীদদের স্বীকৃতির দাবি দীর্ঘদিনের। এছাড়া যশোরের গণহত্যা দিবসের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মারক নেই। তিনি কবর সংরক্ষণ, শহীদদের স্বীকৃতি ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম