নাসিরনগরে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষে তিন খুন
আসামি মৃত ব্যক্তি প্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক
মো. ফজলে রাব্বি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নির্বাচনি বিরোধের জেরে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হওয়ার পর এখনো থমথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি গোয়ালনগরের ১০ গ্রামের জনজীবন। সংঘর্ষের এক সপ্তাহ পর ১ এপ্রিল নাসিরনগর থানায় পালটাপালটি মামলা করেছে দুপক্ষ। মামলাগুলোর এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি মামলায় ১৭৭ জন এবং আরেকটিতে ২৬৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সংঘর্ষে জড়িতদের পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে মৃত, শয্যাশায়ী, প্রবাসী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য ব্যক্তিকে।
এ ঘটনায় হওয়া একটি মামলার বাদী মো. জহল মিয়া। তার স্বাক্ষরিত এজাহারের কপি অনুযায়ী, মামলায় ১১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৬-৭শ জনকে আসামি করে ৩০ মার্চ নাসিরনগর থানায় এজাহার জমা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক চাপে ১ এপ্রিল এজাহার সংশোধন করে আরও ৫০ জনের নাম যুক্ত করে ১৭৭ জনকে আসামি করে আবার এজাহার জমা দেওয়া হয়। সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় এক সাংবাদিক ও তার বাবাকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় নাম যুক্ত করার জন্য নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বশির উদ্দিন চাপ দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বশির উদ্দিন বলেন, কাউকে আসামি করার বিষয়ে আমি কোনো চাপ দিইনি। মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে, এ বিষয়ে পুলিশ ভালো বলতে পারবে।
পুলিশ জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সকালে গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী এমএ হান্নানের সমর্থক ও রহিম গোষ্ঠীর সদস্য জিয়াউর রহমানকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। এ ঘটনায় স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান মামুনের সমর্থক এবং গোয়ালনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেমের গোষ্ঠীর শিশু মিয়াকে সন্দেহ করতে থাকেন তিনি।
পরে কারাগার থেকে বের হয়ে জিয়াউর রহমান শিশু মিয়াকে মারধর করে তার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেন। এ ঘটনার পর থেকেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরপর ১৭ মার্চ সকালে রহিম গোষ্ঠীর লোকজন কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিকালে উভয় পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
এরই জেরে কয়েকদিন প্রস্তুতি নিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে লোকজন এনে ২৪ মার্চ সকালে ফের কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালায় রহিম গোষ্ঠীর লোকজন। পরে কাশেম গোষ্ঠীর লোকজনের পক্ষেও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন এসে সংঘর্ষে যোগ দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলে।
একপর্যায়ে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে গোয়ালনগর স্কুলপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও বড় গোষ্ঠীর সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান নিহত হন। একই দিনে সংঘর্ষে নিহত হন আক্তার মিয়া নামেও একজন। এছাড়াও সংঘর্ষে উভয় পক্ষের শতাধিক লোক আহত হয়। সংঘর্ষের পরদিন ২৫ মার্চ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাফাজুল ইসলাম নামে আরও একজন।
গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত। কয়েকজন নেতার উসকানিতে বিষয়টি এতদূর গড়িয়েছে।
মামলার এক আসামি গোয়ালনগর ইউনিয়নের সিমেরকান্দি গ্রামের মুজিবর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম। যিনি ছয় মাস ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তাকে হত্যা মামলার ১০৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
মামলায় ১১০ নম্বর আসামি করা হয়েছে জামাল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে। তিনি প্রায় ৩০ বছর আগেই মারা গেছেন। আর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার শরীফপুর গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব জারু মিয়াকে করা হয়েছে মামলার ১৭৬ নম্বর আসামি, তিনি ছয় মাস ধরে শয্যাশায়ী। মৃত ব্যক্তিকে আসামি করার ব্যাপারে জামাল মিয়ার বড় ভাই কামাল মিয়া বলেন, আমার ভাই ৩০ বছর আগেই অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। শুনলাম তাকেও নাকি হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদী মো. জহল মিয়ার মোবাইল ফোনে কল করলে তার মেয়ে সেটি রিসিভ করেন। তিনি বলেন, বাবা অনেকদিন ধরে বাড়িতে নেই। কাছে মোবাইলও নেই তার। তিনি মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন না।
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, গোয়ালনগরে তিনটি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে। পুলিশ মামলাগুলো তদন্ত করছে। নিরপরাধ কেউ আসামি হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
