যশোরের সাতমাইলে ‘গরুর হোটেল’
রয়েছে থাকা-খাওয়ার সুবিধা
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যশোরের শার্শা উপজেলার সাতমাইল হাটে সুজনের ‘গরুর হোটেল’। এই হোটেলে বিশ্রামে গরু। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতমাইলের পশুর হাট বসে মঙ্গলবার। এটি যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট। এই হাটের আশপাশেই রয়েছে গোটা ৩০টি ‘গরুর হোটেল’। যেখানে বিশ্রামে থাকে গরু, বিনিময়ে গরুর মালিককে দিতে হয় টাকা।
গত মঙ্গলবার হাট থেকে একটি গরু কিনে আনেন পাশের কলারোয়া উপজেলার সাহেব আলী নামে এক ব্যক্তি। রাখেন হাটের ভেতরেই থাকা গরুর জন্য তৈরি একটি হোটেল বা রেস্ট হাউজে। স্থানীয়রা অবশ্য একে বলে ‘খাটাল’। চৈত্রের তীব্র গরমে একটু প্রশান্তির জন্য এই রেস্ট হাউজে থাকা মোটর ছেড়ে পাইপে করে পানি ছিটিয়ে গরুটিকে গোসল করিয়ে দিচ্ছিলেন তার মালিক। আর এই গরুর হোটেলের মালিকের নাম মনিরুজ্জামান সুজন। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার জমিতে গরুর নিরাপদে রাতযাপনে বছর চারেক আগে তৈরি করেন এই প্রতিষ্ঠানটি।
মনিরুজ্জামান সুজন বলেন, জায়গাটি ভাড়া নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বছর চারেক আগে এখানে নিজ খরচে একটি শেড তৈরি করি। এই শেডে ২৫টি এঁড়ে গরু রাখা যায়। তবে গাইগরু হলে কিছু বেশি হয় সংখ্যায়। হাটে দূর-দূরান্ত থেকে যারা গরু বিক্রি করতে আসেন, তাদের যেসব গরু সেই হাটে বিক্রি হয় না, সেগুলো রেখে যান। পরবর্তী হাটে এখান থেকেই বিক্রির জন্য তোলেন। সেক্ষেত্রে গরুপ্রতি (এঁড়ে) প্রতিদিন দুইশ টাকা এবং গাইগরু হলে একশ টাকা দিতে হয়। সেবা হিসাবে এখানে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা, বিচুলি (খড়) আর পানি দেওয়া হয়। আর গরুমালিক যদি চান বিচুলির সঙ্গে খৈল, ভুষি ইত্যাদি খাওয়াতে পারেন। মাসে কেমন আয়-রোজগার হয় জানতে চাইলে সুজন বলেন, খেয়ে পরে বেঁচে আছি ভাই। মাসশেষে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে পাঁচ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল আর একজন শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছে।
সাতমাইল এলাকার বাসিন্দা মাছের ঘের ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বিদ্যুৎ। বাজারে রয়েছে তার এটি মোটর পার্টসের বড় দোকানও। তিনি বলেন, গরুর সেবার জন্য তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় লোকজন বলে খাটাল। কিন্তু আমি বলি, গরুর রেস্ট হাউজ। ১০-১২ বছর ধরে আমিও এই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। প্রায় দেড় বছর ধরে ভর্তুকি দিয়ে আসছি। তিনি বলেন, হাটে যে গরু বিক্রি হয় না, পরের হাটে পরিবহণ খরচ বাঁচাতে কিংবা ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট এড়াতেই মূলত লোকজন তাদের গরু রেখে যান। আমরা সে সব গরুর দেখভাল করি। গরুর জন্য পানি আর খড় সরবরাহ করি। গরুর মালিক চাইলে ভুষি, খৈল, খুদ বা গরুর জন্য যা যা পুষ্টিকর, সেগুলো সরবরাহ করেন। গরুপ্রতি প্রতিদিন তাকে দিতে হয় একশ টাকা। আর শুধু দিনের বেলায় রাখলে দিতে হয় ত্রিশ টাকা।
মাসে মাসে কেন ভর্তুকি দিচ্ছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘লোভে ভাই! আগে যখন বাজার ভালো ছিল, তখন প্রতি হাটে সব বাদে ৫-৬ হাজার টাকা থাকত। আগে যেভাবে ব্যবসা করেছি, এখন তার জন্য ভর্তুকি দিচ্ছি। আবারও যদি ভারত বা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে গরু আসে, আমাদের এই হাটের ব্যবসা ফের জমজমাট হবে।’
হাটের ঠিক উলটো পাশে বাগআঁচড়া গ্রাম। এই এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি গরুর হোটেল। গলির ভেতর রাস্তার গায়ে প্রথম যে দোতলা বাড়ি, তার মালিকের নাম মনিরুজ্জামান মনি। উপরে সপরিবারে থাকেন মনি, নিচতলায় রয়েছে গরুর হোটেলটি। মনি বলেন, তিন শতক জমির উপরে এই দোতলা করেছি। গরুর জন্য তৈরি আমার এই ‘রেস্ট হাউজের’ আয়েই চলে সংসার। তিনি বলেন, বছর ১২ আগে আমাদের এই ব্যবসা ছিল জমজমাট। তখন ভারত থেকে গরু আসত দেদার। মানুষজন টাকা-পয়সার দিকে তাকাত না। অনেকেই তাদের গরু রেখে যেত, আমাদের আয়-রোজগারও ভালো হতো। প্রসঙ্গত, ৫ আগস্টের পর নানা কারণে সাতমাইলের এই পশুর হাটের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছিল। সম্প্রতি আবারও জমজমাট হয়ে উঠেছে। সামনে কোরবানির ঈদ ঘিরে হাটটি আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
