Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

ইঞ্জিন ও রেলপথে বসছে অত্যাধুনিক ডিভাইস

লেভেল ক্রসিংয়ে প্রাণ বাঁচাবে সাইরেন

Icon

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লেভেল ক্রসিংয়ে প্রাণ বাঁচাবে সাইরেন

রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোয় প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কাড়ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। রেলের মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই লেভেল ক্রসিংয়ে সংঘটিত হচ্ছে। এমন অবস্থায় মানুষের জানমালের সুরক্ষায় স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সরকার ‘লেভেল ক্রসিং সুরক্ষা’ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। ইঞ্জিন ও রেলপথে বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ডিভাইস। যে ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষাবার্তা দেবে। একই সঙ্গে লেভেল ক্রসিংগুলোয় বসানো হচ্ছে বিশেষ ‘অটো সাইরেন’ সিস্টেম ডিভাইসও। শুরুতে রাজধানীর লেভেল ক্রসিংগুলো, পরে সবকটি ক্রসিংয়ে এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। লেভেল ক্রসিংগুলোয় সুরক্ষা নিশ্চিত প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

প্রহরী না থাকলেও ট্রেন আসছে কি না, ওই প্রযুক্তি কিছুক্ষণ আগে থেকেই জানান দেবে যানবাহনচালক ও পথচারীদের। রেল জানাচ্ছে, বিশেষ প্রযুক্তিনির্ভর এই মাইক্রোচিপ এমনভাবে তৈরি, যার সাহায্যে ট্রেন আসার আগেই লেভেল ক্রসিং গেটের আশপাশের মানুষজন তা জেনে যাবেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর সেই চিপের সতর্কীকরণ আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাবে আপনাআপনি। সামনে লেভেল ক্রসিং থাকলে ট্রেনের চালকও পাবেন গতি কমানোর সতর্কবার্তা। ইঞ্জিন ও রেলপথেও বসানো হবে বিশেষ ডিভাইস। লেভেল ক্রসিং থেকে ৫০০ মিটার আগে ট্রেন পৌঁছালে ওই চিপের সক্রিয়তায় সাইরেন বাজতে শুরু করবে। ট্রেন যত এগোবে, ততই তীব্র হবে সাইরেনের আওয়াজ। আবার লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে ট্রেন যত দূরে যাবে, তার সঙ্গে তাল রেখে ধীরে ধীরে কমে যাবে সেই শব্দ।

বৃহস্পতিবার বিকালে রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে ডিজি ভালো বলতে পারবেন। সন্ধ্যার দিকে যুগান্তরের এই প্রতিবেদক কথা বলেন রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রেলে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোয়। এসব দুর্ঘটনা কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য রেল দায়ী নয়। সড়কযান, যানবাহনের চালকরাই মূলত দায়ী। সড়কে চলাচলকারী গাড়িই লাইনে উঠে পড়ছে। এতে রেলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করাও যাচ্ছে না। রেলের অনুমোদন ছাড়াই এলজিইডি, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃক শত শত অবৈধ লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হয়েছে। ক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনায় ট্রেনযাত্রী ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। মো. আফজাল হোসেন আরও বলেন, এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমরা এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছি। অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্রসিংগুলোয় দুর্ঘটনা রোধে অত্যাধুনিক ডিভাইস স্থাপন করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত লেভেল ক্রসিংগুলোয় ডিভাইস এবং অটো সাইরেন সিস্টেম ৩/৪ মাসের মধ্যে স্থাপন করা হবে। ইঞ্জিন, রেলপথ ও লেভেল ক্রসিংগুলোয় বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ডিভাইস ও সাইরেন সিস্টেমগুলো। যে ডিভাইস ও অটো সাইরেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষাবার্তা দেবে। অটো সাইরেন সিস্টেমগুলো লেভেল ক্রসিংয়ের নির্ধারিত দূরত্ব থেকেই টানা সাইরেন বাজতে থাকবে, যা ক্রসিংয়ের দুপাশে থাকা যানচালক ও পথচারীরা শুনতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার লেভেল ক্রসিং সুরক্ষাবিষয়ক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন রেলওয়ে মহাপরিচালক। বৈঠকে রেলওয়ের দুই অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকসহ উভয় অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে সারা দেশে রেললাইন ঘিরে ২ হাজারের বেশি অবৈধ লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হয়েছে। এখনো প্রতিনিয়তই নির্মাণ করা হচ্ছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব কাজে বাধাদান কিংবা বন্ধও করতে পারছে না। এক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে না। অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করতে এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরগুলোয় অন্তত ২০ বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বৈঠকে একাধিক রেলওয়ে কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা ছাড়া অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দুই যুগে রেলওয়ের প্রচেষ্টায় ২৫-৩০টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ করার ১/২ দিন না যেতেই লোহার বেড়া ভেঙে আবার লাইনের ওপর দিয়ে ইচ্ছামতো সড়ক তৈরি করা হয়েছে। বাধা দিলে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চড়াও হয়েছে স্থানীয়রা। মাঠ পর্যায়ের হিসাবে, পুরো রেলে ছোট-বড় ৩১৫৭টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। যার মধ্যে অবৈধ ২৩৭৩টি। প্রহরী রয়েছে মাত্র ৭৮৪টিতে। অর্থাৎ ২৩৭৩টি লেভেল ক্রসিং উন্মুক্ত!

সংশ্লিষ্টরা জানান, সুরক্ষিত লেভেল ক্রসিং না থাকায় উচ্চমূল্যে ক্রয় করা ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন ইঞ্জিন ও কোচ গড়ে ৬৭ কিলোমিটার গতি নিয়ে চালাতে হচ্ছে। ডিভাইস ও সাইরেন সিস্টেম নিশ্চিত করা হলে দুর্ঘটনা একেবারেই কমে আসবে। রেলওয়ে যান্ত্রিক ও প্রকৌশল দপ্তর সূত্র জানায়, একেকটি লেভেল ক্রসিংয়ে অত্যাধুনিক ডিভাইস, সাইরেন ও ইঞ্জিনে বিশেষ সেন্সর স্থাপন সম্পন্ন করতে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ হবে। সেই হিসাবে ২৩৭৩টি লেভেল ক্রসিং সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম