Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

নারী-শিশু নির্যাতন মামলা

সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ

৭০ শতাংশ মামলায় খালাস আসামিরা, বিচারের অপেক্ষায় দেড় লাখ মামলা * দেড় যুগে মৃত্যুদণ্ড ৫, বিভিন্ন কারাগারে আছে দেড়শ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি * দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না হলে অপরাধপ্রবণতা বন্ধ হবে না-ড. তৌহিদুল হক, সমাজ ও অপরাধ গবেষক

আবদুল্লাহ আল মামুন

আবদুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ

কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ উদ্ধার করা হয় কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর রক্তাক্ত লাশ। ডিএনএ পরীক্ষায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রমাণ মিললেও শুরু থেকেই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। থানা পুলিশ, ডিবি, সিআইডি হয়ে বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার পর দীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের লোকজন। ২০২৪ সালে রুহুল আমিন ও সোহেলসহ ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জে ধর্ষণের শিকার হয় এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিশোরী। ৬ বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিচার শুরু হয়নি। সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

শুধু আলোচিত এসব ঘটনাই নয়, গত এক দশকে ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো মামলারই বিচারের চূড়ান্ত কূলকিনারা করা যায়নি। বর্তমানে দেশের আদালতসমূহে এ সংক্রান্ত দেড় লাখের মতো মামলার বিচার ঝুলছে।

গত মে মাসে সুপ্রিমকোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে এক গবেষণায় দেখা গেছে-নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। ৩২টি জেলায় ৪৬ ট্রাইব্যুনালে গত বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি ও রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করা হয়। আইনানুযায়ী, ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। এসব মামলায় শুনানির তারিখ পড়েছে গড়ে ২২ বার। ১৩ শতাংশ মামলায় আপস করা হয়েছে। তবে রাজধানীর পল্লবীতে সম্প্রতি ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় হয়েছে। যা দেশের বিচারের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, কোনো নারীকে ধর্ষণ বা নির্যাতনের পর অপরাধী শাস্তি পাওয়ার দৃষ্টান্ত খুবই কম। অপরাধের পর দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা কমে গেছে। জড়িতদের দ্রুত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তৈরি করা না গেলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বন্ধ হবে না।

ব্র্যাক ও সুপ্রিমকোর্টের গবেষণার তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। অন্যদিকে, হাইকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন রয়েছে। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাত্র ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে এবং প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রায় দেড় হাজার মামলা বিচারাধীন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত সংঘবদ্ধভাবে ও এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচজনের ফাঁসি হয়েছে। একই অপরাধে দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় দেড়শ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন, যাদের রায় এখনো কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্সসহ নানা জটিলতায় তাদের রায় কার্যকর করা যায়নি বলে জানা গেছে। মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী যুগান্তরকে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার চার ভাগের এক ভাগ ঘটনাও মিডিয়ায় আসে না। কেবল আলোচিত এবং গ্যাং রেপের মতো ঘটনাগুলো সামনে আসে। আবার কখনো অপরাধীরা শক্তিশালী হলে সেটাও লোকাল মিডিয়া দিতে পারছে না। তার মতে, প্রতিটি ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মনিটরিং করতে হবে। নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল এমন পুলিশ ও বিচারকের মাধ্যমে তদন্তসহ বিচার কাজ নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া প্রতিরোধের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের মাধ্যমে এবং সুপ্রিমকোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত সঠিক তদন্ত ও অপরাধীদের শনাক্তে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত সময়ে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা আমাদের কাজ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম